• শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১ ১৪২৫
  • ||
  • আর্কাইভ

বঙ্গবন্ধুর পদধুলিতে ধন্য বিয়ানীবাজারবাসীর প্রতি

প্রকাশ:  ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৬:২২
ছরওয়ার হোসেন, নিউ ইয়র্ক
প্রিন্ট

আধুনিক প্রগতিশীল সমাজে দুনিয়ার কোথাও এমন নজির নেই যে, সরকারী উদ্যোগে শহরের মধ্যস্থ পুকুর ভরাট করে অযাচিত মার্কেট নির্মিত হয়েছে। হ্যাঁ, অপ্রয়োজনীয় পুকুর ভরাট করে মানুষের কল্যানে প্রতিষ্টিত হয়েছে দাতব্য প্রতিষ্টান- হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, টেকনিক্যাল ইনষ্টিটিউট, সরকারী অফিস-আদালত, লাইব্রেরী, পার্কপ্রভৃতি। কিন্তু, একটি সচেতন ও জ্ঞান-গুনে আলোকিত জনপদ সিলেটের বিয়ানীবাজারে হচ্ছে এর উল্টো। উপরন্তু, বিয়ানীবাজারে এ পুকুরের প্রয়োজনীয়তাও অপরিসীম ।

সিলেট জেলা পরিষদের উদ্যোগে বিয়ানীবাজার উপজেলা সদরের হৃৎপিন্ডস্থিত (শহরের উত্তরবাজারে সিলেট-বিয়ানীবাজার সড়ক সংলগ্ন) সরকারী পুকুর ভরাট করে মার্কেট নির্মানের পথে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। সয়েল টেষ্ট শেষে চুড়ান্ত সার্ভেও সমাপ্তিপথে ধাবমান। হ্যাঁ, এটি ভরাট করে মার্কেট নির্মানের বিরুদ্ধে সামাজিক মিডিয়ায় অনেক আলোচনা-সমালোচনার পর এবং দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিবাদমূখর অনেক লেখালেখির শেষে যখন একটি গণসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে এরই মাঝে প্রকাশিত হলো পুরো পুকুর ভরাট করে নয়, পুকুরকে মধ্যখানে রেখে চারপাশ ভরাট করে চতুর্দিকে কয়েকতলা মার্কেট নির্মিত হবে। উদ্দেশ্য 'জেলা পরিষদের আয় বাড়ানো'! মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত শেষের কবিতার অংশখানি-‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?’

গনমানুষের প্রশ্ন, বিয়ানীবাজারে মার্কেটের কি এতোই অভাব? বিয়ানীবাজারের বড় বড় বিপনি বিতানগুলোতো এক্ষেত্রে অনেক জেলা শহরকেও হার মানাবে- তবে কেন এ অযাচিত উদ্যোগ? পুকুরের চারপাশ ঘিরে মার্কেট নির্মিত হলে এ পুকুর কি বাঁচবে না ময়লা আবর্জনার ভাঁগাড়ে পরিণত হবে? তাছাড়া জনহীতকর কাজে (পুরাতন হাসপাতালের জন্য) দান করা সুন্দর-মনোরম ভূমির উপর মার্কেট নির্মানের মধ্যদিয়ে সত্যিকারেই কারা আর্থিক উপকৃত হবে? সরকারী কর্মকর্তাগণ না রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ? সচেতন মহল দেশের অন্যান্য স্থানের জেলা পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নির্মিত মিউনিসিপালিটি মার্কেটগুলোর আর্থিক দূর্ণীতি, পরিচালনাজনীত দুরাবস্থা ও মার্কেটগুলোকে ঘিরে রাজনৈতিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে দেখে এবং এ সংক্রান্ত সংবাদসমূহপাঠে এটাই মনে করে যে, বিয়ানীবাজারে জেলা পরিষদের কল্পনীয় মার্কেটের অবস্থাও তদ্রুপ হবে। সরকার বদলের সাথে সাথে মার্কেটের রাজনৈতিক মালিকানারও বদল ঘটবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখলের মতো। যা এধরনের মার্কেটের নিয়তির বিধান! তবে কি কালের আবর্তে একটি জনকল্যানমূলক মহৎ কাজে দানকৃত ভূমির উপযোগীতা সমাজের কিছু মানুষের পকেটভারীর উৎস হতে যাচ্ছে? এরকম হাজারো প্রশ্ন আজ বিয়ানীবাজারের বাতাসে ভেঁসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু, এক অজানে ভয়ে সবাই স্তব্ধ! অথচ, অন্তরালে মানুষ ক্ষুব্ধ

দেশে-বিদেশে এ মার্কেট নির্মানের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিক্রিয়া হলো যে, সিলেট জেলা পরিষদ যদি সত্যিকারার্থে এ ভূমির মালিকানাপ্রাপ্ত হয় এবং তারা যদি মনে করে যে, এ ভূমি পতিত না রেখে কাজে লাগাবে তবে জনকল্যানের অন্য পথগুলোতে সহজেই দৃষ্টিপাঁত করা যায় এবং পুকুরের অবয়বকে বহাল রেখে চারপাশ ঘিরে অন্যান্য মানবিক ও সৃজনশীল উদ্যোগগুলো গ্রহন করা যেতে পারে। 
যেমনঃ ক ) বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব ও শহীদ স্মৃতি পার্ক স্থাপন:
শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের ইতিহাস প্রাচিন। কিন্তু, প্রেসক্লাবের নেই স্থায়ী নিবাস। আজব্দি গুরুত্বপূর্ণ প্রেসক্লাব ভাসমান একটি সংস্থা। বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব বৃহত্তর সিলেটের উপজেলাভিত্তিক প্রথম প্রেসক্লাব বলে স্বীকৃত। চাইলে পুকুরের অবয়ব বহাল রেখে গড়ে উঠতে পারে স্থায়ী প্রেসক্লাব ও সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র। প্রেসক্লাবের আওতায় একটি পাবলিক লাইব্রেরী ও একটি সম্মেলন কক্ষ নির্মান করা হবে অত্যন্ত সময়োপযোগী। একইসাথে প্রতিষ্টা করা যেতে পারে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী একটি ‘শহীদ স্মৃতি পার্ক’। 

যেখানে দেশী-বিদেশী ছায়াতরু আর ফুলের সমারোহে সুরম্য ফলকসমূহের মাধ্যমে মহান স্বাধীনতার লক্ষে বাঙালীর সংগ্রামী ইতিহাসকে উদ্ভাসনের সাথে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সংগ্রামে বিয়ানীবাজারের গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্যকে দৃষ্টিনন্দনভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি ঐতিহাসিক বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, জমিদারী শোষন বিরোধী নানকার আন্দোলন থেকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিয়ানীবাজারের কৃতি সন্তানদের অবদান, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের শহীদ, নেতৃত্বদানকারী ও অংশগ্রহনকারীদেরকে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করা যাবে। এছাড়াও মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতিকে আমরা মার্বেল পাথরের ফলকের মাধ্যমে সম্মানের সঙ্গে ধরে রাখতে পারবো। যা ভবিষ্যত প্রজন্মের সম্মূখে বিয়ানীবাজারের গৌরবগাঁথাকে একই স্থানে উপস্থাপনের সূবর্ণ সুযোগ বটে।

বঙ্গবন্ধুর পদধুলিতে ধন্য বিয়ানীবাজার:
বিয়ানীবাজারের যা কিছু গৌরবময়, যা কিছু ঐশ্বর্যমন্ডিত তার মধ্যে অনন্য গৌরবে অত্যুজ্জ্বোল যে, বিয়ানীবাজারের মাটি বাংলার স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পদধুলিতে ধন্য। ১৯৬৬সালে বাংলার স্বাধীনতার সোঁপান ঐতিহাসিক ৬দফা আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষে বিয়ানীবাজার সফরে আসেন বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মহান নেতা, দুনিয়ার স্বাধীনতাকামী শোষিত, নির্যাতিত-নিপিড়িত মানুষের বিপ্লবী কন্ঠস্বর, বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ট সন্তান, বিশ্বস্বীকৃত 'পয়েট অব পলিটিক্স', জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর আগমনে বিয়ানীবাজারে তৎকালীন সময়ের স্মরণকালের শ্রেষ্ট জনসভা অনুষ্টিত হয়েছিলো এই পুকুর লাগোয়া তখনকার বিয়ানীবাজারের ’পল্টন ময়দান’ বলে খ্যাত বিয়ানীবাজার পোষ্ট অফিস মোড়ে । জীবনের বিনিময়ে যে নেতা একটি দেশ স্বাধীন করে দিয়েছেন তাঁর সম্মানার্থে কিংবা তাঁর বিয়ানীবাজার আগমনের স্মৃতিকে গৌরবোজ্জ্বলভাবে জাগরুক রাখতে আমরা কোনধরনের উদ্যোগ গ্রহনে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা উপরোক্ত ‘প্রেসক্লাব ও শহীদ স্মৃতি পার্ক’ প্রস্তাবনার সাথে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বিয়ানীবাজার আগমনের স্মৃতিকে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য গৌরবজনকভাবে উপস্থাপনের বিষয়টি একীভূত করতে পারি। এতে প্রকারান্তরে গোটা বিয়ানীবাজারবাসীই অশেষ সম্মান ও গৌরবের অংশীদার হবে।

আমরা শুধু সভা আর বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর বিয়ানীবাজার আগমনের স্মৃতিকে নিয়ে গর্ববোধ করি, ঐতিহাসিক জমিদারী প্রথা বিরোধী নানকার আন্দোলনের মহান নেতা স্বর্গীয় বাবু অজয় ভট্টাচার্য ও আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপণ করি, ১৯৬৬’র ৭ই জুন ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহীদ, বিয়ানীবাজারের গর্ব শহীদ মনু মিয়া, শহীদ বুদ্ধিজীবি দার্শনিক ডঃ জিসি দেব, শহীদ কুটু চান্দ, শহীদ আব্দুল মান্নান, শহীদ বাউল কমর উদ্দিনপ্রমূখের নির্মম মৃত্যু আর তাদের স্মৃতিকে উজ্জ্বল করে রাখার জন্য কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিতে পারি কিংবা আবেগ উত্তেজনায় বক্তার পর বক্তা থাপ্পড় মেরে টেবিল ভেঙ্গে ফেলার উপক্রম ঘটে কিন্তু, সুযোগের সদ্ব্যবহারে তাদের কীর্তির প্রতি যথাথত সম্মান প্রদান করা বাঞ্চনীয়। যদিও আমরা গত চল্লিশ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে শুধুই 'কাঁদছি'- কিন্তু, বাস্তবে সমূহ সাধ্য থাকা সত্বেও তাঁদেরকে স্মরণীয় রাখতে, তাঁদের প্রতি যথাযত শ্রদ্ধা জানাতে যতটুকু উদ্যোগী হওয়ার কথা ছিলো তা কি আমরা পেরেছি? বরং অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতি সম্মান জ্ঞাপনের কার্যকর উদ্যোগ থেকে বিরত থেকেছি- একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। যদিও দেশী-প্রবাসীদের উদ্যোগে স্থানিকভাবে কিছু উদ্যোগ সম্পন্ন হয়েছে তথাপি তা আশানুরূপ নয়। তদুপরি, সমূহ ক্ষমতা থাকা সত্বেও দেশমাতার কৃতি সন্তানদের স্মৃতিকে জাগরুক রাখতে কিছু করতে না পারার ব্যর্থতা ঢাকতেই কেবল তথাকথিত ‘সুযোগের অভাব’র কথাই বলে আসছি। এরই আলোকে উক্ত ‘শহীদ স্মৃতি পার্ক’ হতে পারে একটি উত্তম মাধ্যম ও উৎকৃষ্ট সুযোগ। একই সাথে একটি উপজেলার শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক উন্নয়ন, শিল্প-সাহিত্য ও আন্দোলন-সংগ্রামসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখা শত শত সোনালী সন্তানদের প্রতি আমাদের ও অনাগত প্রজন্মের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান জ্ঞাপনের একটি স্বর্ণালী ক্ষেত্র । যা অনস্বীকার্য্য ।
খ) টেকনিক্যাল ইনষ্টিটিউট স্থাপন:
বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত উপজেলাভিত্তিক টেকনিক্যাল ইনষ্টিটিউট স্থাপনের জন্য বিয়ানীবাজারে উপযুক্ত জমি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সহজে এ পুকুরের চারপাশ ঘিরে কয়েকতলা ফাউন্ডেশনের টেকনিক্যাল ইনষ্টিটিউট স্থাপনই হতে পারে এ মনোরম জমিটুকুর ব্যবহারের উত্তম ক্ষেত্র।
গ) পাবলিক লাইব্রেরী ও আই, সি, টি ট্রেিনং সেন্টার স্থাপন:
নিউ ইয়র্কের বিশ্বখ্যাত নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরী সংলগ্ন ব্রায়ান্ট পার্কের আদলে এখানে নির্মান করা যেতে পারে একটি সরকারী পাবলিক লাইব্রেরী, আই, সি, টি ট্রেনিং সেন্টার বা তথ্য-প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, একটি সম্মেলন কক্ষ এবং একটি উন্মুক্ত মঞ্চ যা পুকুরকে স্বমহীমায় রেখেই অনায়াসে নির্মান করা সম্ভব। যা বিয়ানীবাজারের নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে মোহনীয় করে তুলবে। তদুপরি, উপরোক্ত বিষয়গুলো প্রতিষ্টার মধ্যদিয়ে অনায়াসে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রতি আমাদের ঐতিহ্যিক অনুরাগ উজ্জ্বলতরভাবে প্রস্ফুটিত হবে।

অতীব গুরুত্বপৃর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, আজ কিংবা ভবিষ্যতে এই পুকুর ভরাট বা আংশিক ভরাট করে বা পুকুরের চারপাঁশ ঘিরে যা কিছুই নির্মান করা হোক না কেন আমরা যেন কোনক্রমেই এ জমির মূল মালিক, যিনি এ মূল্যবান ভূমি পুরাতন হাসপাতালকে দান করেছিলেন তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপণ করতে ভূলে না যাই। কেননা, যেমন গুণীর কদর ব্যতিত গুণীর জন্ম হয়না, তেমনি দানশীলতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সংস্কৃতিই কেবল দানশীলতার প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে। তাই যদিও কালক্রমে আজ এই ভূমি সিলেট জেলা পরিষদের মালিকানায় সমর্পিত হয়েছে, তথাপি এর উপর যা কিছুই নির্মিত হোক না কেন তাঁর সাথে যেন সশ্রদ্ধচিত্তে এ ভূমির মূল মালিক (মহতী দাতা)’র প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা সন্নিবেশিত থাকে।

উপরোল্লেখিত বিষয়গুলোর কোনটি কতটুকু বাস্তবায়ন করা যাবে তা সাধারণ চোঁখে আমাদের পক্ষে অনুমান করা কিছুটা কঠিন হতে পারে। তাই বিষয় নির্ধারণে প্রয়োজন একজন স্থপতির পরিকল্পনা ও ডিজাইন। যার জন্য আমরা বিয়ানীবাজারের কৃতি সন্তান, দেশ বরেণ্য স্থপতি শাকুর মজিদের দ্বারস্থ হতে পারি সহজেই। জনাব শাকুর মজিদের নাম এজন্যই বলছি যে, বিয়ানীবাজারের কর্তাব্যক্তিদের তাঁর সঙ্গে রয়েছে খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক এবং তিনি বিয়ানীবাজারের মাটি, মানুষ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রকৃতই অবগত। কেননা, এধরনের কাজে সংশ্লিষ্ট জনপদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে স্থপতির পূর্বজ্ঞান থাকা বাঞ্চনীয়।

বিয়ানীবাজারের সচতনমহল নিরব কেন?
এ পুকুরের চারপাশে মার্কেট বানানোর অপর নামই পুকুরকে গ্রাস করা। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে দেশ ও প্রবাস থেকে প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং সামাজিক ব্যক্তিবর্গের লেখালেখি ও প্রতিবাদ প্রকাশ পেয়েছে। দেশে নানান অঙ্গনের মানুষের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে আরো অনেকের প্রতিবাদী মতামত জানতে পেরেছি। আমরা এ বিষয়ে লেখালেখি করার কারণে আরো কিছু মানুষের অসন্তুষ্টির কথাও অবগত হয়েছি। কিন্তু, জানিনা, জেলা পরিষদের এমন উদ্যোগের পরও বিয়ানীবাজারের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গণের নেতৃবৃন্দরা চুপ কেন? তবে কি আমাদের সম্মূখে জনকল্যানের লক্ষে দানকৃত ভূমিতে মার্কেট নির্মানের নামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দুই বিঘা জমি'র করুণ পটভূমিই রচিত হতে যাচ্ছে ? দেশে থাকতে যাদের দেখতাম বিয়ানীবাজারের জনকল্যানমূলক নানা বিষয়ে তৎপর থাকতে আর আমরাও তাদের অনুসরণ করতাম, আজ তারা কেন নিশ্চুপ? যারা বিয়ানীবাজারের উন্নয়নে, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক জাগরণে সর্বদা ভূমিকা রেখেছেন, প্রতিবাদী সভা-সমাবেশে যাদের ভূমিকা ছিলো স্বপ্রণোদিত, আজ সে সকল সম্মানিত নেতৃবৃন্দগণ কেন স্তব্ধ ? এ পুকুর ভরাট করে মার্কেট বানানোর বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে সর্বস্থরের প্রগতিশীল মানুষের অবস্থান, কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে কেন দ্বিধান্বিত? এ বিষয়ে আমাদের সাংবাদিক ভাইদের এগিয়ে আসা উচিৎ নয় কি? কেন তাঁরা এ জমিটুকু তাঁদের প্রেসক্লাবের জন্য বরাদ্ধ চাচ্ছেন না, অথচ বিয়ানীবাজারে তাদের কয়েকটি জনপ্রিয় সংগঠন রয়েছে এবং যে কোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে তারা অধিক কর্মচঞ্চল ও ঐক্যবদ্ধ। কেন বিয়ানীবাজারের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আজ স্তব্ধ? তবে কি আমাদের সমূহ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কেবল দুর্বলের প্রতি সীমাবদ্ধ? আসুন, সকল জড়তা ভেঙ্গে অতীতের মতো বুকভরা সাহসে সিলেট জেলা পরিষদের এ অনভিপ্রেত উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের প্রতিবাদী কন্ঠকে শানিত করি।

আমাদের করণীয়:
এ পুকুর বিয়ানীবাজার পুরাতন হাসপাতালের আওতাধীন ছিলো বলে জানি। আর এ হাসপাতাল পরিত্যক্ত হওয়ার পর হাসপাতালের সমূহ ভূমি এবং পুকুরকে গ্রাস করার জন্য শুধু আজ নয়, অতীতেও বার বার অপচেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু, বিয়ানীবাজারবাসী তা মেনে নেয়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সকলেই চেয়েছে এ জমি জনহীতকর কাজে ব্যবহৃত হোক- আজও যে গণদাবী বিদ্যমান, কিন্তু প্রতিবাদী কন্ঠগুলো স্তব্ধ। আজ যদি ছলে বলে কৌশলে মার্কেট নির্মান করা হয় তবে অনাগতকালের প্রজন্মের নিকট এ মার্কেট বিয়ানীবাজারের চলমান রাজনৈতিক অঙ্গনকে 'দূর্নীতি ও দূর্বৃত্তপনা'র স্মারক হিসেবে চিহ্নিত করবে। অথচ, বিয়ানীবাজার কি সত্যিই দূর্বৃত্তদের কবলে? অবশ্যই না। বরাবরের মতো এখনো আমরা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক পরিচ্ছন্ন আছি। তবে কেন একটি অপবাদ আমাদেরকে কলুষিত করবে?

হ্যাঁ, এখানে মার্কেট নির্মিত হলে অস্বচ্চ রাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বার্থান্বেষী মানসিকতা তোষনের একটি ঘৃণ্য অপবাদে আমরা সমর্পিত হবো। বর্তমান প্রেক্ষাপঠে মানুষের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ জানানোর অবারিত মাধ্যম সামাজিক মিডিয়াগুলোতে ইতোমধ্যে রব উঠেছে যে, বিয়ানীবাজারে পুকুর ভরাট করে অযাচিত মার্কেট নির্মিত হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ মার্কেটই হতে পারে সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্ধন্ধী দল বা প্রার্থীগণের একটি সুযোগ্য হাতিয়ার। আর এ ধরণের বক্তব্যগুলো প্রকারান্তরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই দিচ্ছেন। সুতরাং, ক্ষমতার বদৌলতে এধরনের অপ্রয়োজনীয় ও উচ্ছিষ্ট কাজ থেকে জেলা পরিষদকে বিরত হওয়া উচিত। অন্যথায় সমগ্র অপবাদের জন্য মূলত দায়ী হবে বর্তমান সরকার ও বিয়ানীবাজারের সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ঝড় বা বৃষ্টি যেমন সকলের উপর দিয়েই প্রবাহিত হয়, তেমনি ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘৃণ্য অপবাদ আমাদের সকলকেই কলুষিত করবে। কেননা, দিন শেষে সকলেই এক নৌকার যাত্রী। এজন্য আমি বিয়ানীবাজারের সরকার দলীয় সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দেরও দৃষ্টি আকর্ষন করছি।


আমি শুধু বলতে চাইনা যে, আসুন, প্রতিবাদী কন্ঠে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সিলেট জেলা পরিষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াই, বরং আমি আরো বলবো, আমার উপরোক্ত বক্তব্য যেন বিয়ানীবাজারের সমূহ নেতৃত্বের বোধগম্য হয়।

আমি না হয় অন্ধকারে আলো দেখতে পাইনা, শূন্যতায় বুনতে পারিনা ক্ষেত্র সৃষ্টির স্বপ্ন, কিন্তু আমার জন্মমাটি বিয়ানীবাজার যে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর খেলায় উত্তীর্ণ সর্বদাই। যে মাটি বৃটিশবিরোধী নানাকার আন্দোলনের সূতিকাঁগার, যেখানে পা পড়েছে বাংলার শ্রেষ্ট বিপ্লবী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর, যেখানে জন্ম নিয়েছেন পন্ডিত-সাধকগণ, যেথায় জন্ম শহীদ মনু মিয়া, দার্শনিক ডঃ জিসি দেবসহ অসংখ্য গুনীজন, যেথায় শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের তীর্থস্থান, এমনকি সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ; যিনি দেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছুরণ করে যাচ্ছেন জ্ঞানের দ্যুতি, তিনিও এ মাটির সন্তান। যেখানে এখনো সাংবাদিকদের অনুষ্টানের মধ্যমনি প্রধান অতিথি হয়ে আগমন ঘটে দেশবরেণ্য সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন'র কিংবা সাহিত্যে বাংলা একাডেমী পদক লাভ করেন বিয়ানীবাজারেরই আলোকিত সন্তান স্থপতি শাকুর মজিদ- সেখানে পুকুর ভরাট করে মার্কেট নয়, নির্মিত হোক অন্ধকার বিনাশী আলোর ফোয়ারা, প্রাণস্পন্ধনের তীর্থক্ষেন্দ্র এবং আলোর পথে জয়যাত্রা থাকুক অব্যাহত। জয় বাংলা।

লেখক: ছরওয়ার হোসেন, নিউ ইয়র্ক,