• রবিবার, ২৭ মে ২০১৮, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

কালের কঙ্কাল: কালের এক কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ

প্রকাশ:  ৩১ জানুয়ারি ২০১৮, ১৬:০৩
ফাহিমা মীরা
প্রিন্ট
কাল বা সময় বরাবরই মানুষের আগ্রহের জায়গা। সময়ের রূপ আজও অধরা। ‘কালের কঙ্কাল’ নামটি শুনেই একটা অনুভূতি খেলা করে। মনের পর্দায় চিত্রিত হয় সময়ের একটা রূপকল্প। আগ্রহের মানচিত্রজুড়ে বসে একটা ব্যাকুলতা। জানার সেই আগ্রহকে পরিপূর্ণ করার মতো জীবনানুভূতি দিয়েই তরুণ কবি শেখ মেহেদী হাসান সাজিয়েছেন তাঁর প্রথম প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ ‘কালের কঙ্কাল’। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হবে অমর একুশে বইমেলা-২০১৮তে। মাঝি বাঁধনের প্রচ্ছদ করা ‘কালের কঙ্কাল’ প্রকাশ করবে চমনপ্রকাশ। বিভিন্ন সময়ে লেখা ৩৯টি কবিতায় সাজানো ৪৮ পৃষ্ঠার মলাটবদ্ধ এই কাব্যগ্রন্থটি যেন একটানা পড়ে ফেলার জন্য পাঠক হৃদয়ে আকুলতা তৈরি করে।

‘কালের কঙ্কাল’ শেখ মেহেদী হাসানের কবি হয়ে ওঠার এক আনুষ্ঠানিক প্রকাশ। এই বইয়ের কবিতাগুলো দিয়ে  কবি যেন কাব্যচ্ছলে গল্প শুনিয়েছেন  ১৯৯৫-২০১৮ দীর্ঘ সময় পরিক্রমার আর ব্যবচ্ছেদ করেছেন সমসাময়িক বাস্তবতার।  সমগ্র বইজুড়ে তিনি খুঁজে ফিরেছেন কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর আর ব্যক্তিগত জীবন দর্শন দিয়ে  ব্যাখ্যা করেছেন ‘ভালোবাসা’, ‘মানবতা’, ‘সময়’, ‘অনুভূতি’ ও ‘বেঁচে থাকা’র মতো জটিল বিষয়গুলো। প্রায় দুই যুগের মতো লম্বা সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে লেখা কবিতাগুলোতে যেমন এসেছে বিষয়ের বৈচিত্র্য, তেমনি পরিবর্তিত হয়েছে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু অপরিবর্তিত রয়েছে জীবন দর্শন।

শেখ মেহেদী হাসান ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং গবেষক ও অনুবাদক। বিশ্বসাহিত্য ভাণ্ডার থেকে অর্জিত জ্ঞানের সঙ্গে নিজস্ব ভাবনা, জীবনানুভূতি, কালের প্রতি সচেতনতা ও স্বতন্ত্র স্টাইলের মিশেলে তৈরি করেছেন এক আলাদা কাব্যময়তা। বাংলাকে তিনি দূরে ঠেলে দেননি, বরং করেছেন সমৃদ্ধ। এই কাব্যগ্রন্থে 'আমি যেন একা এলোমেলো ভাসি ' ও 'ইনিস্ফ্রী দ্বীপে' নামের William Wordsworth ও W. B. Yeats এর দুটো কাব্যানুবাদ স্থান পেয়েছে। কবিবন্ধু সৈয়দ আহসান কবীর যথার্থই বলেছেন, ‘ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি নিলেও তিনি মাইকেলের প্রথম জীবনের মতো নন।  লিখেছেন ও লিখছেন বাংলা কবিতা।’

প্রথম দিকের কবিতাগুলো পড়লে পাঠকের মনে হবে এ যেন কবি তাঁর ভালোবাসার গল্প বলছেন। এখানে আছে অনুভূতির প্রকাশ, মান-অভিমান, বিরহ-বেদনা, খুনসুটি, অনুভূতির ওঠানামা সব মিলিয়ে তারুণ্যের ভালোবাসার স্বাভাবিক ভঙ্গিমা। কিন্তু আর একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে এই ভালোবাসার প্রকাশগুলো কোনোটাই বাস্তবতার ঊর্ধ্বে নয়। প্রতিটা ভালোবাসাময় অনুভূতির পরপরই এসেছে জিজ্ঞাসা। পরে এ জিজ্ঞাসাগুলোরই উত্তর মিলেছে বাস্তবতার নির্মম রূপে, যেখানে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন মানবতাকে। তিনি চিত্রিত করেছেন সমসাময়িক সমাজকে যেখানে রোহিঙ্গা শিশুর করুণ মৃত্যুতেও বিশ্ব বিবেক নীরব দর্শক অথবা ‘বন্দি সভ্যতা’র বেড়াজালে আবদ্ধ ‘এ জীবন ভার্চুয়াল’। আবার এত কঠিন বাস্তব রূপ থেকে পাঠক মন সরিয়ে নিতে দিয়েছেন ছন্দোবদ্ধ ছড়ার স্বাদ। মশা মারতে কামান ব্যবহার করে তিনি হাসিয়েছেন পাঠককে এবং আমপাতা জামপাতা বলে নিয়ে গেছেন শৈশবে। কিন্তু 'মশা',  'জালিয়াতি', 'রাজনীতি ' এই ছড়াগুলোতেও তিনি বিচ্যুত হননি আত্মজিজ্ঞাসা থেকে। এর মধ্য দিয়েও তিনি তুলে ধরেছেন বর্তমান সমাজের অনেক অসংগতি। এরপর স্মরণ করিয়েছেন ‘অন্তিম যাত্রা’র কথা। জীবনের সব আয়োজনের অসাঢ়তাকে আর একবার মনে করিয়ে ‘বেঁচে থাকার গল্প’ শুনিয়ে টেনেছেন সমাপ্তি। আর শেষ করেছেন জীবনের জন্য বাস্তবসম্মত কিছু উপদেশ দিয়ে। ‘কালের কঙ্কাল’ কাব্যগ্রন্থটি যেন প্রতিটি পাঠকের জীবনের এক কাব্যিক প্রকাশ।

মানবজীবনের স্বভাবসিদ্ধ রূপ হলো ভালোবাসা। আর এই রূপকে খোঁজা দিয়েই কবি তাঁর দীর্ঘ পথ পরিক্রমণ শুরু করেছেন। ‘কালের কঙ্কাল’ এ ভালোবাসার নিত্য এবং চিরায়ত রূপই ধরা পড়েছে সাবলীলভাবে।  ‘ভালোবাসা কি’ এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে গিয়ে তুলে ধরেছেন ভালোবাসার বিভিন্ন রূপকে। 'কঠিন',  'তরল' থেকে শুরু করে 'অতীত’, 'স্মৃতি' এমনকি 'মরীচিকার মহামায়া'য় খুঁজেছেন ভালোবাসার সংজ্ঞা। বাস্তবতার রূপেও তিনি একে খুঁজতে বাদ রাখেননি। তাই তো অবলীলায় বলে ফেলেছেন ‘এটা কি আর্তচিৎকারের ঠিক আগের/অস্ফুট স্বরের তীব্র গোঙানি?’ এভাবে কবির ভালোবাসার স্বরূপ খোঁজার প্রয়াস যেন মানুষের আত্মজিজ্ঞাসার একটি উপস্থাপন। আবার ‘পোড়া ভালোবাসা’য় বাস্তবতার নির্মমতা দেখে শিউরে ওঠা কবি পরক্ষণেই ‘একটু উষ্ণ ছোঁয়া’ বা ‘কণ্ঠে একটি শব্দের’ প্রতীক্ষায় থাকেন অথবা ‘ঝড়ের রাতে অন্ধকারে’ ভালোবাসার খোঁজ করেন। এবং যখন বলে ওঠেন ‘ঠোঁটে-দাঁতে ভাগাভাগির গল্প’ তখন যেন দাম্পত্য অনুভূতির এক চিত্রকল্প ফুটে ওঠে।

দেশ, সমাজ, মানবতা ও ব্যক্তিসত্তার প্রতি দায়বদ্ধতা 'কালের কঙ্কাল'-এ উপলব্ধ।  মানবতা যেন একটা স্বতন্ত্র বিষয় এই কাব্যগ্রন্থে। এই বিষয়টি পাঠক প্রথমেই উপলব্ধি করতে পারবেন যখন এর 'উৎসর্গ'টি দৃষ্টিগোচর হবে। ‘অবহেলিত, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত ও ভাগ্যাহত মানবসন্তানদের...’ উৎসর্গ করেছেন কবি। তিনি বারবার বঞ্চিত মানবতার কথা বলেছেন। মানবতার মুক্তির আর্তনাদ ধ্বনিত হয়েছে 'বন্দি সভ্যতা', 'মানবতার মৃত্যু', 'ঘুমাও বাছা' এবং শিরোনাম কবিতা 'কালের কঙ্কাল'-এ। যখন কবি বলিষ্ঠ কণ্ঠে সেই রোহিঙ্গা শিশুকে আহ্বান  করেন, ‘তুমি নিশ্চিত আসবে মহামারী রূপে/ভাসিয়ে দিতে আমাদের সকলকে/এক মহাকালের মহাপ্লাবনে...’ তখন মানবতার মুক্তির প্রার্থনা পাঠক হৃদয়কে করে আবেগ আপ্লুত। আবার 'মানবতার মৃত্যু'তে যখন উচ্চারিত হয় ‘আমি বর্ষা বিলাস দেখিনি, আমি বর্ষা-বিরহ দেখেছি’, তখন পাঠক মন ক্ষণিকের জন্য হলেও নত হয় নিজের যাপিত ‘বর্ষা বিলাস’-এর কথা স্মরণ করে।

কবিতায় যেমন সমসাময়িকতা এসেছে তেমনি এসেছে ইতিহাসের সেই একুশ।  ভাষা আর সত্তা অবিচ্ছেদ্য—এই উপলব্ধি 'আমার একুশ' ও 'আমার ভাষা' কবিতা দুটোয় গেঁথে আছে। যখন উচ্চারিত হয় ‘আমার ভাষা আমারই তো’ তখন বুকের ঠিক বাঁ পাশ দিয়ে একটা তীব্র অনুভূতির স্রোত বয়ে যায়। এত স্পষ্ট আর সাবলীল কথা মনে এক অদ্ভুত শক্তি এনে দেয়, স্মরণ করিয়ে দেয় নিজস্বতাকে,  নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়কে।

একটি বিশেষ কবিতার কথা না বললেই নয়; নাম 'চেয়েছি তোমাকে'। শিরোনামে মনে হয় কোনো প্রেমের কবিতা। হ্যাঁ, প্রেমের কবিতা, তবে এই প্রেম কোনো সাধারণ রমণী বা পুরুষের জন্য নয়। কবি শেখ মেহেদী হাসান উল্লেখ করে দিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মশতবার্ষিকীতে কবিকে উৎসর্গ করে লেখা যেখানে তিনি নজরুলকে কামনা করেছেন ‘এক ফালি চাঁদের প্রচ্ছন্নতায়’।

উপমার ব্যবহারে কবি দেখিয়েছেন অনন্যতা। কবিতায় উপমার স্বচ্ছন্দ প্রয়োগ সৃষ্টি করেছে কবির নিজস্ব কাব্যময়তা। আর চিত্রকল্পে কবি দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা। 'কালের কঙ্কাল'-এর কবিতাগুলোর শরীরজুড়েই যেন চিত্রকল্প। কবিতার এক একটা নামই যেন এক একটা চিত্রকল্প—'অনাদ্রিত অনুভূতি', 'কালের কঙ্কাল', 'হৃদয়ে রক্তঘর', 'যাযাবর অনুভূতি'  প্রভৃতি নাম পাঠমাত্রই চোখের সামনে ভেসে উঠে সম্ভাব্য এক চিত্র। এ ছাড়া অন্যান্য অলংকারের ব্যবহারও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, যা কবির কাব্যসত্তাকে করেছে স্বতন্ত্র। শব্দচয়নে কবি দেখিয়েছেন নিপুণতা।

ছন্দ বিচার করতে গেলে দেখা যায় অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অমিত্রাক্ষর—বাংলা ছন্দের এই তিনটি ধারাকেই তিনি এনেছেন তাঁর কবিতায়। আবার ভাবের ও বিষয়ের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন মুক্তক ছন্দ। মোটকথা, কবি তাঁর অনুভূতির প্রকাশে খেলাচ্ছলে ব্যবহার করেছেন ছন্দ।  প্রচ্ছদেও রয়েছে সৃষ্টিশীলতার পরিচয়। প্রচ্ছদশিল্পীর মার্জিত প্রচ্ছদই যেন ধারণ করছে 'কালের কঙ্কাল'-এর সারমর্মকে যা সহজেই নজর কাড়ে।

স্বতঃস্ফূর্ততা 'কালের কঙ্কাল'-এর এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য; কিন্তু করুণ সুরের আধিক্য সেই স্বতঃস্ফূর্তাকে কিঞ্চিৎ ম্লান করেছে, যদিও জীবনের গল্পে করুণ সুর বরাবরই বাড়ন্ত। সর্বোপরি অনুভূতির প্রসবনে পাঠক মন অবগাহন করে পাবে আপনত্বের স্বাদ।  কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা 'আমি আছি এখনও'র মতো শেখ মেহেদী হাসানের কবিতার রেশও থেকে যাবে পাঠক হৃদয়ে। ‘আমি আসি তোমার নিঃশ্বাস হয়ে/ঘুম হয়ে শান্তির, এতটুকু শ্রান্তি হয়ে তোমার ক্লান্তির’ লাইন দুটো যেন ভালোবাসার চিরন্তন বাণী হয়ে পাঠকমনে ঠায় করে নেবে সতত।