• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

রাজাকার লিয়াকত-রজবের ফাঁসির আদেশ

প্রকাশ:  ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ১২:৪২
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মুড়াকরি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ও কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাব্যুনাল। তাদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে সাজা কার্যকরের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

সোমবার (৫ নভেম্বর) বেলা পৌনে ১১টার দিকে চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন।

এর আগে রোববার (৪ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুাল রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেন।

প্রসিকিউটর রেজিয়া সুলতানা চমন রোববার সাংবাদিকদের জানান, মুক্তিযুদ্ধকালে হবিগঞ্জের লাখাই থানার ফান্দাউক ইউনিয়ন রাজাকার কমান্ডার লিয়াকত আলী ও কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানা আলবদর কমান্ডার রজব আলীর বিরুদ্ধে গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও লুটপাটের মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি অভিযোগ রয়েছে।এর মধ্যে রয়েছে লাখাইয়ের কৃষ্ণপুরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১২৭ জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফান্দাউকে নিরীহ নারী-পুরুষকে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের অভিযোগ। তারা দুইজন পাশাপাশি তিন থানা হবিগঞ্জ জেলার লাখাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে এসব অপরাধ সংঘটিত করেন।

গত ১৬ আগস্ট যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম শেষ হলে এ মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমান (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল।

২০১৬ সালের ১ নভেম্বর লিয়াকত-রজবের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়। এ দুজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৮ মে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। সেই থেকে তারা পলাতক রয়েছেন।

তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত লিয়াকত আলী হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ২০১০ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাটি হয়।

আসামি লিয়াকত আলী ১৯৭১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মুসলিম লীগের সদস্য হিসেবে ফান্দাউক ইউনিয়নে রাজাকার কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। অন্য আসামি রজব আলী ১৯৭১ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘের ভৈরব হাজী হাসমত আলী কলেজ শাখার সভাপতি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভৈরবে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে অষ্টগ্রামে আল বদর বাহিনী গঠন করে কমান্ডার হন তিনি।দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে তার বিরুদ্ধে দালাল আইনে তিনটি মামলা হয় এবং ওইসব মামলার বিচারে তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। ১৯৮১ সালে রজব ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ‘আমি আলবদর বলছি’ নামে বই লেখেন।

রাজাকার লিয়াকত-আমিনুলের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ:

মামলায় তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন ও লুটপাটসহ মোট সাতটি বিষয়ে অভিযোগ আনা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাশাপাশি তিন জেলায় (হবিগঞ্জ জেলার লাখাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে) তারা দুইজন বিভিন্ন অপরাধ করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) মো. নূর হোসেন জানান, বর্তমানে হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার এক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি মো. লিয়াকত আলী আমেরিকায় এবং রজব আলী দেশেই পলাতক আছেন।

মামলায় তাদের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছে-

প্রথম

১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভোর ৫টা থেকে বেলা পৌনে দুইটা পর্যন্ত লিয়াকত আলী, আমিনুল ইসলাম ও তার সঙ্গীরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীদের সঙ্গে নিয়ে লাখাই থানার কষ্ণপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে গণহত্যা ও লুটপাট করে। নুপেন রায়ের বাড়িতে রাধিকা মোহন রায় ও সুনীল শর্মাসহ ১৫ জন জ্ঞাত ও ২৮ জন অজ্ঞাত হিন্দুকে গুলি করে হত্যা করে।

দ্বিতীয়

১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা থেকে পৌনে ৩টা পর্যন্ত লিয়াকত আলী, আমিনুল ইসলাম ও তার সঙ্গীরা পাকিস্তানিদের সঙ্গে নিয়ে চন্ডিপুর গ্রামে চন্দ্র কুমার ও জয়কুমারসহ ৯ জন হিন্দুকে গুলি করে হত্যা করে এবং গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে লুটপাট চালায়।

তৃতীয়

১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টার দিকে লাখাই থানার গদাইনগর গ্রামে লিয়াকত আলী, আমিনুল ইসলাম ও পাকিস্তানি আর্মি কর্তৃক চিত্ত রঞ্জন দাসের বাড়ির বাইরের আঙ্গিণায় জগদ্বীশ দাস, পিয়ারি দাস ও মহাদেবমাসসহ ২৬ জ্ঞাত-অজ্ঞাত আরও ৭/৮ জন আহত করে, তবে তারা বেঁচে যান।

চতুর্থ

১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর লিয়াকত আলী, আমিনুল ইসলাম পাকিস্তানি আর্মিদের সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণপুর এলাকায় অভিযান চালানোর সময় হরিদাস রায় ও খিতিস রায়সহ ১০ জন হিন্দুকে অপহরণ করে অষ্টগ্রাম থানার সদানগর গ্রামের শ্মশানঘাটে নিয়ে গেলে রাত ১০টার দিকে আর্মিরা তাদেরকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ও বেয়নেট চার্জ করে। এতে ঘটনাস্থলে ৮ জন মারা যান এবং ২ জন আহত হয়ে বেঁচে যান।

পঞ্চম

লিয়াকত আলী, আমিনুল ইসলাম ও তার সঙ্গীরা ৭১ সালের ভাদ্র মাসের প্রথম সপ্তাহে যেকোনো দিন বেলা ১০টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসির নগর থানার ফান্দাউক বাজার থেকে রঙ্গু মিয়া ও বাচ্চু মিয়াকে অপহরণ করে নিয়ে রাজাকার ক্যাম্পে টর্চার সেলে নির্যাতন করে।

পরের দিন দুপুর ১২টার দিকে রঙ্গু মিয়াকে নাসির নগর থানাধীন ডাকবাংলোর পাশে দত্তবাড়ির খালে হত্যা করে মরদেহ পানিতে ফেলে দেয়। অপহৃত বাচ্চু মিয়া অর্থের বিনিময়ে রাজাকারদের হাত থেকে মুক্তি পান।

ষষ্ঠ

১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর দুপুর আনুমানিক ১২টার সময় লিয়াকত আলী, আমিনুল ইসলাম, রাজাকার ও পাকিস্তানি সঙ্গীদের নিয়ে অষ্টগ্রাম থানার সাবিয়ানগর গ্রামে চৌধুরী বাড়ির উত্তর পাশে খালি জায়গায় ইশা খা ও আরজু ভূইয়াসহ ৫ জনকে গুলি করে হত্যা করে।

সপ্তম

১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর দুপুর আনুমানিক ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার দিকে লিয়াকত আলী, আমিনুল ইসলাম, রাজাকার ও পাকিস্তানি সঙ্গীদের নিয়ে অষ্টগ্রাম থানার সাবিয়ানগর গ্রামে খাঁ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মনির খাঁ ও সফর আলীসহ আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতাকামী ১০ জনকে গুলি করে হত্যা করে।

ওই সময় রাজাকাররা বাড়িতে লুটপাট করে। এসব ঘটনায় ১৯৭২ সালে আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলীর বিরুদ্ধে অষ্টগ্রাম থানায় তিনটি মামলা করা হয়। ওই অভিযোগে তার যাবজ্জীবন দণ্ড হয়েছিল।

/এসএম

রায়,আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
apps