• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

‘খুব ইচ্ছে করে আবার মাঠে যেতে’

প্রকাশ:  ৩০ অক্টোবর ২০১৮, ২৩:১৫
রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রিন্ট

‘ক্রিকেট আমার প্রেম, আমার ভালোবাসা। ক্রিকেট আমার রক্তে মিশে আছে। ভালোবাসার এই খেলাটি রেখে দম বন্ধ হয়ে আসে বাড়িতে বসে থাকতে। টেলিভিশনে টিম মেয়েদের মাঠে খেলতে দেখলে কলিজা ছিঁড়ে যায়। মনে হয় আমি সুস্থ থাকলে এই টিমে খেলতাম।’

নগরীর দরগাপাড়া এলাকায় জাতীয় দলের ক্রিকেটার চামেলী খাতুন এ কথা বলেন। ক্রিকেটার চামেলী বলেন, ‘মাঠের বাইরে দীর্ঘদিন আছি। বাসার এ ঘর ও ঘর করে দিন কাটে। সেই সময়ের (খেলা) কথাগুলো কষ্ট দেয়। তখন অঝরে কাঁদা ছাড়া উপায় থাকে না। মেডেল (পুরস্কার) গুলো জড়িয়ে ধরে থাকি। খুব ইচ্ছে করে আবার মাঠে যেতে। কিন্তু পারি না ক্রিকেটের ব্যাট-বল হাতে ছুঁতে। আবার দেশের হয়ে খেলতে চাই।’

খেলাধুলা আর অভাবের সংসারে পড়াশোনা হয়নি তার। চামেলী হেতেম খাঁ গার্লেস স্কুলের নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপাড়া করেছেন। খেলাধুলার প্রতি খুব ভালোবাসা ছিলো চামেলীর। তাই অনেক সময় ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ছেলেদের সঙ্গে মাঠে চলে যেতেন। সারাদিন এ মাঠে ও মাঠে খেলে বেড়াতো সে। অনেক সময় বাড়িতে বাবা-মায়ের বকা খেতে হতো চামেলীকে। বাড়ি থেকে বলা হতো মেয়ে মানুষ তুমি। এভাবে বেড়ালে বিয়ে হতে সমস্যা হবে। তার পরেও খেলা ছাড়েনি সে। এক পা, দু’পা করে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ হয় চামেলীর। এতে জীবনের মোড় ঘুরে যায়। বাবার অভাবের সংসারে স্বপ্নের প্রদীপ জ্বালায় চামেলী। চামেলীর উপর্জনের টাকায় চলতে থাকে পুরো সংসার।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় জরাজীর্ণ স্যাতস্যাঁতে বাড়ি। দুইটি মাত্র ঘর। সেখানেই পরিবারের বাকি চার সদস্যদের নিয়ে চামেলীর ঠিকানা।

২০০৭ সালে প্রথম ফুটবল খেলার মধ্যে দিয়ে অভিষেক ঘটে চামেলীর। সেই সময় তিনি বিভিন্ন দলে ফুটবল খেলেছেন। তার পরে ঢাকার ফরিদা নামের এক কোচের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এর পরে চামেলীর সেখান থেকে শুরু হয় ক্রিকেট প্র্যাক্টিস। তার পরে খুলনায় ক্রিকেট খেলায় অংশগ্রহণ করেন। খুলনার সেই খেলায় ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন চামেলী। নারী ক্রিকেট দলে নিয়মিত খেলোয়াড় হন তিনি।

এছাড়া ২০০৮ সালের আনসার ভিডিপির হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন চামেলী। এসময়ে তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যোগ হয় বিভিন্ন দেশে খেলার সুযোগ। দেশগুলোর মধ্যে, চায়না, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, মালোয়শিয়া ও ভারত। চামেলী দাপটের সঙ্গে নিজের নৈপূণ্য জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটিক্স, ফুটবল এবং প্রমীলা ক্রিকেটে খেলেছেন।

ভালোই চলছিলো খেলোয়াড়ি জীবন। ২০১১ সালে কয়েকদিনের জন্য ছুটি হয় চামেলীসহ বাকি খেলোয়াড়দের। এসময় বসে না থেকে আবহনী ক্রীড়া চক্রের মাঠে প্রাক্টিসে যান চামেলী। এ সময়ে নেমে আসে চামেলীর জীবনে অন্ধকার অধ্যায়। সেই সময় পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায় তার। এতে দৌঁড়ানো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তার। তার পরেও অসুস্থতার বিষয়টি চেপে থেমে থাকেনি সে। পরে নিজের ইচ্ছায় জাতীয় দল থেকে অবসর নেন। পরে দেখা দেয় মেরুদণ্ডের হাড়ে ব্যথা। এই অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘ আট বছর ধরে খেলার মাঠ থেকে বাইরে চামেলী।

বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় নগরীর দরগাপাড়ার বাড়িতে চার দেওয়ালের মধ্যে সময় কাটছে তার। চামেলীকে ডাক্তারের পরামর্শে প্রায় থেরাপি দিতে যেতে হয় নগরীর হেতেম খাঁ ছোট মসজিদ এলাকায়। পরিবারের টানাপোড়েনের কারণে হেঁটে চিকিৎসা নিতে যেতে হয়। তার উপর ডাক্তারের দেয়া ওষুধ চলছে প্রতিদিন।

ডাক্তারের কথায় মেরুদণ্ডে দুই হাড়ের ফাঁকে থাকা নরম ডিস্কগুলো নষ্ট হয়ে গেছে তার। এর ফলে অবশ হয়ে যাচ্ছে পুরো ডান পাশ। এই অবস্থায় দ্রুত দেশের বাইরে সার্জারির করার পরামর্শ দিয়েছে চিকিৎসকরা। চামেলীর পুরো চিকিৎসার জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকার খরচ হবে বলে জানানো হয়েছে। তাই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ সমাজের সকলের কাছে তার চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়েছে তার পরিবার।

বর্তমানে চামেলীর আনসার ভিডিপি অফিসের চাকরির ওপর তার পুরো পরিবার নির্ভর করে। অসুস্থতার কারণে সেই চাকরিও যায় যায় অবস্থা। এখন শুধু সুস্থ হয়ে মাঠে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে চামেলী।

ওএফ

চামেলী,ক্রিকেট
apps