• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসছেন ২৬ অক্টোবর

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আলোচনার পর আসছে সিদ্ধান্ত

প্রকাশ:  ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ২০:২৬
আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া
প্রিন্ট

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আলোচনার পর আসছে সিদ্ধান্ত। জিটুজি-প্লাসের সিন্ডিকেট মুক্ত কর্মী প্রেরণে কোন পদ্ধতিতে খোলা যেতে পারে, তা নির্ধারণে ২৬ অক্টোবর কুয়ালালামপুর থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে আসছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে দক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতায় পাইপলাইনে আটকে থাকা জিটুজি-প্লাসের ৭০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এর আগে, জিটুজি প্লাসে অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে দেশটিতে কর্মী পাঠিয়ে আসছিল বাংলাদেশ। এক তরফা ও অনৈতিকভাবে ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠার পর ১ সেপ্টেম্বরের পর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বাতিল করে দেশটি।

এই প্রেক্ষাপটে দক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতায় ২৫ সেপ্টেম্বর দুই দেশের কর্মকর্তারা জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক করেন। অনলাইনে নিয়োগের প্রক্রিয়া বাতিল ঘোষণা করার পর থেকে বাংলাদেশি কোনো কর্মীকে আর কাজের অনুমতিপত্র দেয়নি মালয়েশিয়া। কিন্তু ১ সেপ্টেম্বরের আগে কাজের অনুমতি পাওয়া ৭০ হাজার কর্মীর মালয়েশিয়া যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করে ৪ অক্টোবর দূতাবাস থেকে দেয়া হচ্ছে অ্যাটাস্টেশন।

এদিকে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া বাতিল হলেও গত ৩০ আগস্টের আগে যেসব বাংলাদেশি কাজের অনুমতিপত্র পেয়েছেন, তাদের সবাই আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তাদের মালয়েশিয়ায় যাওয়ার ব্যবস্থা করলো দেশটির সরকার। ফলে প্রায় ৭০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত দুই দেশের মন্ত্রি পর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়।

ওই বৈঠকের দুটি দিক ছিল। প্রথমত, কর্মী নিয়োগের নতুন পদ্ধতি ঠিক করা। দ্বিতীয়ত, সে দেশে অনিয়মিত হয়ে পড়া বাংলাদেশের কর্মীদের বিষয়টি সুরাহা করা। এছাড়া অপেক্ষমান কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করা। এদিকে ‘বায়ো রিক্রুটমেন্ট’ পদ্ধতিতে বিদেশে শ্রমিক পাঠাতে বায়রার দেয়া প্রস্তাব বিবেচনা এবং দ্রুততম সময়ে কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, ওই বিষয়ে গঠিত কমিটিকে পদক্ষেপ নিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহান সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন। নতুন পদ্ধতিতে চালু হতে যাওয়া মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে বলেও বায়রার প্রস্তাবে বলা হয়েছে।

শুধু মালয়েশিয়া নয়, অন্যান্য শ্রমবান্ধব দেশভেদে সর্বোচ্চ কত টাকায় একজন কর্মী যেতে পারবেন তারও একটি পরিসংখ্যান প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়েছে। বায়রার পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের দেয়া প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে বিদেশে কর্মী পাঠাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে দীর্ঘ দিন ধরে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক, বিদেশগামী শ্রমিক ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যে যন্ত্রণা পোহাচ্ছেন, তা আস্তে আস্তে দূর হবে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ৮ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহানের নেতৃত্বে ‘বিদেশে শ্রমিক প্রেরণে অভিবাসন ব্যয় কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়’ শীর্ষক মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নতুন পদ্ধতিতে চালু হলে তখন যাতে কম টাকায় এবং বিশৃঙ্খলা ছাড়া শ্রমিকরা যেতে পারেন, সে জন্য গঠিত কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের সচিব জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরোর ডিজিকে নির্দেশ দিয়েছেন।

অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান ৮ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিএমইটির ডিজি ও বায়রা নেতাদের উপস্থিতিতে যৌথসভার আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, আমরা বিদেশে শ্রমিক পাঠাতে ‘বায়ো রিক্রুটমেন্ট’ পদ্ধতি কিভাবে হবে তা সাবমিট করেছি। মন্ত্রণালয় আমাদের প্রস্তাব দেখার জন্য জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরোর ডিজিকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে দিয়েছে। কমিটিতে মন্ত্রণালয়, বিএমইটি ও বায়রার দুইজন সদস্য থাকবেন। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী মহোদয়ও তাদের দেয়া প্রস্তাবটি যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

বৈঠকে বায়রা নেতাদের মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, এত দিন তারা যে ধরনের চিন্তা করছিলেন তার সাথে বায়রার দেয়া প্রস্তাবটির ৯৫ শতাংশ মিল রয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে অথবা তারও আগে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশের জন্য একই পদ্ধতিতে অভিবাসন ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য গঠিত কমিটিকে বলা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে কত টাকা অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে, জানতে চাইলে বায়রা মহাসচিব বলেন, আমরা মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক লাখ ৬০ হাজার টাকার মধ্যেই একজন শ্রমিককে পাঠাতে পারব বলে উল্লেখ করেছি। এ টাকায় কর্মী যাওয়ার পরও সব খরচ বাদ দিয়ে আমাদের ১৫-২০ হাজার টাকা লাভ থাকবে। তা ছাড়া প্রস্তাব মোতাবেক যদি ‘বায়ো রিক্রুটমেন্ট’ পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানো হয় তাহলে কর্মীরা যেমন কম টাকায় বিদেশ যেতে পারবেন, তেমনি দালালদের উৎপাতও কমে আসবে। এসব শুনে কমিটি বায়ো রিক্রুটমেন্ট নিয়ে কাজ শুরু করেছেন।

বোয়ো রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতি হচ্ছে, একজন বিদেশগামী কর্মী জেলা জনশক্তি অফিসে অনলাইন পদ্ধতিতে প্রথমে রেজিস্ট্রেশন করবেন। তিনি যে দেশে যেতে ইচ্ছুক ওই দেশের অভিবাসন ব্যয় কত আছে, তা তিনি নিজেই স্ক্রিনে দেখতে পাবেন। সেই মোতাবেক নিজে তার টাকা তিনি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে জমা করতে পারবেন। এরপর ফিঙ্গারপ্রিন্ট, মেডিক্যাল, ভিসাসহ অন্যান্য প্রসেসিং শেষ হলেই গন্তব্যর উদ্দেশ পাড়ি জমাবেন। মোট কথা দালাল ছাড়াই কর্মীর বিদেশ যেতে কোনো বাধা থাকছে না।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় কোন পদ্ধতিতে কর্মী যাবে; তা নির্ধারণ করতে চলতি মাসের শেষের দিকে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের ঢাকা আসার কথা রয়েছে। দুই দেশের মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের পরই বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলার ও অতিরিক্ত সচিব মো: সায়েদুল ইসলাম জানান, হাইকমিশনার মুহা. শহীদুল ইসলামের কূটনৈতিক তৎপরতায় তার দিক নির্দেশনায় দেশটির প্রসাশনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেই আমরা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়াটি হবে প্রতিযোগিতামূলক, এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, অভিবাসনের ব্যয় কমানো এবং আইনসম্মত উপায়ে অভিবাসনের ব্যবস্থা করা।

আগের পদ্ধতি বাতিল হওয়ার পর নতুন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার আগে অন্তরবর্তীকালীন পদ্ধতি অনুসরণ করবে দুই দেশ। তবে এ প্রক্রিয়ার আওতায় কর্মী নিয়োগ শুরুর আগে এমওইউ (দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক) সংশোধন করা হবে। এই সংশোধনীর জন্য দুই দেশের মন্ত্রিসভার সম্মতি এবং আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ লাগবে।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে কোনো হার নির্ধারণ হয়েছে কিনা জানতে চাইলে শ্রম কাউন্সিলর জানান, অভিবাসন ব্যয় কমানোর বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষ বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো হার বৈঠকে চূড়ান্ত না হলেও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে সিন্ডিকেট করার পায়তারা।

মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্টরা বার বার জানিয়ে আসছেন কোনো মতেই তারা সিন্ডিকেশন করতে দিবেন না। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেশন করতে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। প্রবাসীরা বলছেন, যদি সিন্ডিকেশন হয় তাহলে ফের বন্ধ হয়ে যাবে মালয়েশিয়ার বাজার। এদিকে অভিবাসনের খরচ যাতে কমানো যায় সে বিষয়টিতে জোর দিয়েছে মালয়েশিয়া।

উল্লেখ্য, ২০০৬ ও ২০০৭ সালের পর মালয়েশিয়ায় ভুয়া কোম্পানি দেখিয়ে, ভুয়া পারমিট দেখিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোক এনে এবং সাগর ও আকাশ পথে অবৈধভাবে লোক এনে মালয়েশিয়ায় অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হলে দীর্ঘদিন মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী আনা বন্ধ রেখেছিল। আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমে জিটুজি পদ্ধতিতে লোক প্রেরণ করে তখন মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে কোনো জনশক্তি রফতানিকারক সংশ্লিষ্ট ছিল না। এটা দাবি ছিল যে তাদের যেন সুযোগ দেয়া হয় সে প্রেক্ষিতে জিটুজি-প্লাস অর্থাৎ বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানকারকরাও সুযোগ পেয়েছে।

ওএফ

শ্রম বাজার,মালেয়শিয়া,শ্রমিক
apps