• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

জোট ভাঙ্গলেও ২০ দল কমে না!

প্রকাশ:  ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ২২:৫৯ | আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ২৩:২৫
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট বেশ কয়েকবার ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। তবে তার প্রভাব পড়েনি জোটের নামকরণে। এক বা একাধিক দল বেরিয়ে গেলেও খবরের শিরোনামে পাওয়া গিয়েছে ২০ দলীয় জোটের নামই। বরং জোট ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধে খন্ড-বিখন্ড হয়েছে বেরিয়ে যাওয়া দলগুলো। তাদের অংশ বিশেষকে যুক্ত করে শেষ পর্যন্ত ঠিকই টিকে গেছে ২০ দলীয় জোট!

জানা যায়, ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম এবং ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠনের ঘোষণা দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সেই জোট থেকে প্রথমেই বেরিয়ে যান এরশাদ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের অংশীদার হয় জাতীয় পার্টি। ২০০৯ সাল থেকেই তিনি এবং তাঁর দল ক্ষমতার ভাগীদার।

এরপর ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ১৮ দলীয় জোট। পর্যায়ক্রমে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও সাম্যবাদী দল যোগ দিলে তা পরিণত হয় ২০ দলীয় জোটে।

বিএনপির এই জোটে প্রথম ভাঙ্গন লাগে ২০১৫ সালে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে জোট থেকে বেরিয়ে যায় শেখ শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)। প্রয়াত নীলু ওই সময় অভিযোগ করেছিলেন, ২০ দলের জোটে বিএনপি-জামায়াত সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতো।

এর পরের বছরই ফের ভাঙ্গনের মুখে পড়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে দীর্ঘদিনের জোটগত সম্পর্ক ত্যাগ করে ইসলামী ঐক্যজোট। সরাসরি কাউকে দায়ি না করলেও নিজ সংগঠনকে শক্তিশালী করতে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে বলে জানিয়েছিলেন ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী।

জোটে ভাঙ্গনের সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে দিন দুয়েক আগেই। গত মঙ্গলবার (১৬ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলন করে জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি)। দল দু’টির অভিযোগ- জোটের শরিক দলগুলোকে অন্ধকারে রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছে বিএনপি।

সংবাদ সম্মেলনে ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি বলেন, ‘বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলাম। মতপার্থক্য ও মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও জোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সব সময় আন্তরিক ছিলাম। এমনকি ২০১৪ সালের নির্বাচনে নানা ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব থাকার পরও জোট ত্যাগ করিনি। এই ত্যাগকে বিএনপি মূল্যায়ন করেনি।’

তবে এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে পারেননি দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক এম এন শাওন সাদেকী। সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টা পরই ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি এবং মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূইয়াকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেন তিনি। একই সময় ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে নিজেকে দলের নতুন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করে ২০ দলীয় জোটেই থাকার সিদ্ধান্ত জানান তিনি।

গণমাধ্যমকে শাওন সাদেকী বলেন, দলের মহাসচিবসহ হাতে গোনা ৪-৫ জন ছাড়া প্রায় পুরো ন্যাপই ২০ দলীয় জোটে থাকবে। মঙ্গলবারের ২০ দলীয় জোট ছাড়ার সংবাদ সম্মেলনে যারা গিয়েছিল তারাও অধিকাংশ ফিরে আসবে বলে কথা হয়েছে।

একই ঘটনা ঘটেছে জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া দ্বিতীয় দল এনডিপিতেও। এনডিপি চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা এবং মহাসচিব মঞ্জুর হোসেন ঈসা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করায় এবং দলের শৃঙ্খলাপরিপন্থী থাকায় প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. মুত্তাকিম হোসেনকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।’

অন্যদিকে এনডিপির প্রচার সম্পাদক দাবিদার জিয়াউল হকের পক্ষ থেকেও দেওয়া হয়েছে পাল্টা বহিষ্কারের ঘোষণা। তিনিও এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, ‘২০ দলীয় জোট পরিপন্থী কাজে যুক্ত হওয়ায় দলের চেয়ারম্যান পদ থেকে খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা এবং মহাসচিবের পদ থেকে মঞ্জুর হোসেন ঈসাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মো. মুত্তাকিম এনডিপির নতুন চেয়ারম্যান এবং ওসমান গণিকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়েছে।’

এদিকে, বিএনপি জোটের অতীত পর্যালোচনায় দেখা যায়, জোট ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর শরিক দলের মধ্যে ভাঙ্গনের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। ২০১৫ সালে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) প্রয়াত শেখ শওকত হোসেন নিলু ২০ দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দিলেও ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বে দলের একটি অংশ জোটে যুক্ত থাকে।

এর ধারাবাহিকতায় এনডিপির তৎকালীন মহাসচিব মো. আলমগীর মজুমদার এবং চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তাজার মধ্যে পাল্টাপাল্টি বহিষ্কার চলে। আলমগীর মজুমদার জোট ছেড়ে যান, খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা বিএনপি জোটে থেকে যান।

জোটে ভাঙ্গনের ঘটনার প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দলগুলোর খণ্ডাংশকে রেখে দিয়ে বিএনপি ২০ দলের নাম বজায় রেখেছে। অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ লেবার পার্টি। দলটির মধ্যে দুই ভাগ থাকলেও দুই অংশই বিএনপি জোটে যুক্ত রয়েছে।

তবে বারবার ভাঙ্গনের মুখে পড়েও তুলনামূলক ছোট দলগুলোর খন্ডিত অংশ নিয়ে ২০ দলীয় জোট ধরে রাখা কতটুকু যুক্তিযুক্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ সেই বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

/আরাফাত

২০ দলীয় জোট
apps