• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

রাষ্ট্রপতির আকুল আবেদন, প্রধানমন্ত্রীকে করুণ মিনতি...

প্রকাশ:  ০৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১৯ | আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:২২
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট

ভোটের হাওয়া বইছে দেশজুড়ে। জাতীয় রাজনীতিতে নানা নামে ঘটছে রাজনৈতিক মেরুকরণ। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট যেমন সম্প্রসারিত হচ্ছে, ভোটের লড়াইয়ে চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়ে বিএনপিও সেখানে ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। মহানগর নাট্যমঞ্চে ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রাথমিক সূচনা হয়েছে। যদিও তার শেষ দৃশ্য এখনো মঞ্চস্থ হয়নি। শেষ পর্যন্ত ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্য প্রক্রিয়ায় কারা যুক্ত হবেন সেটি নিশ্চিত হতে মধ্য অক্টোবর চলে যাবে।

বিএনপি বহুদিন পর নানা ধরপাকড়, মামলা ও কারাভোগ মোকাবিলা করে ২২ শর্তে অনুমতি নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি বড় সমাবেশ করেছে। রাজনীতি উত্তাপ-উত্তেজনা ও বাহাসে মুখরিত হলেও সব দলের উচিত অবাধ সভা-সমাবেশের অধিকার ভোগ করার পাশাপাশি সংযত আচরণ করার। রাজনৈতিক বক্তৃতা মঞ্চেই শেষ করার। আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ মঞ্চেই থাক। মাঠের রাজনীতি যেন সংঘাতময় না হয়ে ওঠে। বিএনপি যদিও সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলেছে। তেমনি শাসকদল আওয়ামী লীগ সংবিধানের বাইরে একচুল নড়বে না বলে সংবিধানের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে অনড় রয়েছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে এ বিষয়ে তারা পরিষ্কার। বিরোধী দলের সংলাপের প্রস্তাব, ড. কামাল হোসেনের আলটিমেটাম নাকচ হয়ে গেছে। তবে পর্দার অন্তরালে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের জন্য মধ্যস্থতা যে থেমে নেই সেটি নিশ্চিত করে বলা যায়। দুই পক্ষের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী তৃতীয় পক্ষ পর্দার বাইরে থেকে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার সরকারের অধীনেও যে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব সেটি তারাও মনে করেন। এক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রুটিন ওয়ার্ক ছাড়া নির্বাহী ক্ষমতা বলে কিছু থাকবে না। অন্যদিকে নিরপেক্ষ মাঠ প্রশাসন নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সযোগিতা যেমন দেবে, তেমনি নির্বাচন কমিশনকেও পরিবেশ থেকে শুরু করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সবার জন্য সমান প্রচার-প্রচারণার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ যাতে স্বাধীনভাবে তাদের ভোট প্রয়োগ করতে পারে এবং নির্বাচনকালীন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের সব হয়রানি নিপীড়নের বাইরে রাখার গ্যারান্টি দিতে হবে।

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের মানুষের কাছে জাতীয় নির্বাচন রীতিমতো একটি ভোট উৎসব। এবারের নির্বাচনও দেশবাসীর জন্য মহা-উৎসবের ভোট হোক। সব শঙ্কা-সংশয়ের অবসান হোক এটিই সবার প্রত্যাশা। এ দেশে বঙ্গবন্ধুর মতো বিশ্বনন্দিত মহান নেতার নেতৃত্বে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। সেনাশাসনের অসাংবিধানিক এক্সপেরিমেন্ট পরাজিত হয়েছে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়কের নামে সুশীলদের শাসন ইতিহাসে নিন্দিত হয়েছে। ভঙ্গুর হলেও সংসদীয় গণতন্ত্রই মানুষের কাছে উত্তম বলে বিবেচিত হয়েছে। এ কথা সত্য মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠেছে। উন্নয়নের মহাকর্মযজ্ঞ দেখছে বাংলাদেশ। কিন্তু সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় যেমন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি, তেমনি নিশ্চিত হয়নি সুশাসন। এই ভোট উৎসবের মধ্য দিয়ে কার্যকর, প্রাণবন্ত সংসদই নয়, জবাবদিহিতামূলক শাসন ব্যবস্থা ও উন্নয়নের পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে সুশাসন চলবে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।

রাজপথ থেকে হরতাল-অবরোধের মতো অর্থনৈতিক উন্নয়নবিরোধী নেতিবাচক রাজনীতি নির্বাসিত হয়েছে। এটি অনেক সুখের খবর। কিন্তু সব আলোচনা, বিতর্ক, নীতি-নির্ধারণ ও কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠুক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মহান সংসদ। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে লুটেরাদের, অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনের খড়্্গ নেমে আসুক। তাদের আস্ফালনের লাগাম টেনে ধরা হোক। সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা হোক। এটি যেমন প্রত্যাশা তেমনি আগামী দিনের লড়াই দরিদ্রতার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু হোক। একই সঙ্গে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে শক্তিশালী সরকারের পাশাপাশি, শক্তিশালী বিরোধী দলের অস্তিত্ব উদ্ভাসন হোক। শাসন ব্যবস্থায় স্বেচ্ছাচারী, কর্তৃত্ববাদী মনোভাবের অবসানে শক্তিশালী বিরোধী দলের আবির্ভাব ঘটুক।

দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে একের পর এক ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের বসন্ত উৎসব বয়ে যাক।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফিরেছেন। সেখানেও জাতিসংঘসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ যেমন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা করেছেন, তেমনি তিনিও অভিন্ন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সরকারবিরোধী জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিও অতীতের আন্দোলনের উগ্র পথ পরিহার করে রণকৌশল নিয়েছে। নরমে-গরমে সরকারবিরোধী জনমতকে পক্ষে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য করার মধ্য দিয়ে ভোটযুদ্ধে অংশগ্রহণের পথেই হাঁটছে। তাদের প্রার্থীরা নির্বাচনীযুদ্ধে নেমে গেছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী হলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা নিয়ে পর্দার আড়ালে যেমন আলোচনা বইছে, তেমনি মঞ্চে বিএনপি তার মুক্তির দাবিতে সরব হয়ে উঠেছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডন নির্বাসিত ও আদালতের রায়ে দ-িত তারেক রহমান নির্বাচনে এবং রাজনীতিতে যে সহসাই আসতে পারছেন না সেটি প্রায় নিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্যে কী ঘটে সেটি এখন দেখার অপেক্ষা। একুশের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার রায় বিএনপির জন্য কতটা ঝাঁকুনি হয়ে আসবে তার জন্য সবাই ১০ অক্টোবরের দিকে তাকিয়ে আছে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহল সব দলের অংশগ্রহণমূলক বা সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচনের কথা বলতে গিয়ে যে চিত্রপট মানুষের সামনে তুলে ধরছেন সেটি হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে এই দুই দল ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন আশা করা যায় না, তেমনি জনগণের অংশগ্রহণমূলক ছাড়া ভোটের উৎসবও প্রত্যাশা করা যায় না। মিয়ানমারের গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের সাহসিকতার সঙ্গে আশ্রয় দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে শেখ হাসিনা রোল মডেলে পরিণত হয়েছেন। ১০ লাখ শরণার্থীর আশ্রয় ও খাবারের নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি যেমন বিশ্বে মানবতার নেত্রী বা মানবতার জননী খ্যাত সম্মান অর্জন করে পদক লাভ করেছেন, তেমনি বাংলাদেশও একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে প্রশংসিত হয়েছে। এ বিরল সম্মান গোটা দেশের মানুষের জন্য গৌরব ও অহংকারের তেমনি আগামী দিনের অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সবার জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

আমরা আশা করব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি ভোট উৎসবের জন্য প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সব দলের জন্য প্রচার-প্রচারণার পরিবেশ নিশ্চিত করবেন। কোনো দলই সভা-সমাবেশের মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হবে না। ভোটযুদ্ধ হবে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক।

শেখ হাসিনার সরকারের সাফল্যের উচ্চতা যেমন রয়েছে সমালোচনা করার জায়গাও অনেকটা জায়গাজুড়ে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে যে লুটপাট ঘটে গেছে, যে নজিরবিহীন অর্থ পাচার হয়েছে, শেয়ারবাজারে যে কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে তা নিয়েও খোদ অর্থমন্ত্রী বার বার অসহায়ত্ব ব্যক্ত করলেও রাজনীতি ও সিভিল সোসাইটিতে তুমুল বিতর্কের জম্ম দিলেও কার্যকর পদক্ষেপ বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা যায়নি। যায়নি অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা।

বিশ্ব রাজনীতিতে একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা এ বিষয়গুলোর পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গায়েবি মামলায় হয়রানির যে অভিযোগ উঠেছে সেদিকেও দ্রুত নজর দেবেন এবং কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।

শেখ হাসিনা যখন জাতিসংঘে তখন তার সরকারের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে কালো ধারাগুলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করতে যাচ্ছে বা কণ্ঠরোধ করতে যাচ্ছে কিংবা বিশেষ করে স্বাধীন ইলেকট্রনিক ও অনলাইন সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পথ আগলে ধরেছে তা নিয়ে তুমুল বিতর্কের ঝড় বয়ে গেছে। সম্পাদক পরিষদ রাজপথে নামার ঘোষণাও দিয়েছিল। গণমাধ্যমের বিভক্ত ও ঐক্যবদ্ধ সংগঠনসমূহে অভিন্ন ভাষায় প্রতিবাদ করেছে। রাজনীতি করে উঠে আসা স্বাধীনতা সংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সবার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কালো ধারাগুলো চিহ্নিত করে আগামী মন্ত্রিসভায় উত্থাপনের আশা দিয়েছেন। এমনকি সংশোধনেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সম্পাদক পরিষদ পরিষ্কার বলেছে, এই আইনের মধ্য দিয়ে সংবাদ মাধ্যমের কর্মকা-ের ওপর নজদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধান প্রদত্ত সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুলিশকে বিনা ওয়ারেন্টে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্ল­াশি, লোকজনের দেহ তল্ল­াশি এবং কম্পিউটার তার নেটওয়ার্ক এমনকি সার্ভার ও ডিজিটাল প্লøাটফর্ম সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। এমনকি যে কাউকে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে গ্রেফতারের অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতিও নিতে হবে না।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে ভীতির পরিবেশ তৈরির বাহন হিসেবে চিহ্নিত করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কার্যক্রম অসম্ভব করে তোলা হয়েছে। এর আগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় সাংবাদিকসহ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের কারণে অনেক নাগরিককে হয়রানি ও কারাভোগ দেওয়া হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ ও বিচার করার প্রস্তাব করা হলেও এর পরিধি গণমাধ্যমের সীমানায় অবাধে প্রবেশ করে বসেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পঁচাত্তর সালের ১৫ আগস্ট কালো রাতে সংঘটিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে ঘাতকের হাতে গোটা পরিবার হারানোর বেদনা নিয়ে সেনাশাসন কবলিত এক অন্ধকার সময়ে গণতন্ত্রের বাতিঘর হয়ে এ দেশের রাজনীতিতে আন্দোলন-সংগ্রামের পথে নেমেছিলেন। আওয়ামী লীগের ঐক্যের প্রতীক থেকে আপন মহিমায় নেতৃত্বের গুণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির নেতৃত্বেরও প্রতীক হয়েছিলেন। তার সংগ্রামমুখর পথ কণ্টকাকীর্ণ ছিল। কখনো গণতন্ত্রের ময়দানে যুদ্ধ করেছেন, কখনো অগণতান্ত্রিক সামরিক জামানায় অমিত সাহস নিয়ে জীবন-মৃত্যুর মোহনায় কঠিন অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছেন। ৩৮ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দাপটের সঙ্গে বিচরণ করতে গিয়ে কখনো ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা, কখনো গুলি, কখনো বোমা, কখনো ওতপেতে থাকা ঘাতক, কখনোবা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছেন। জীবনে ২৪ বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা শেখ হাসিনা ১৫ বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব করছেন। তার দুঃসময়ের বেদনাসিক্ত দিনগুলোতে দলের নিবেদিত নেতা-কর্মীরা যেমন তার পাশে ছিল, তেমনি পাশে ছিল গণতন্ত্রমনা জনগণ।

আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, আমাদের তারুণ্যে ও পেশাদারিত্ব জীবন তার সঙ্গে পায়ে পায়ে হেঁটেছে। তার কঠিন দুঃসময়ে গণমাধ্যম পাশে ছিল। আজকের মতো বসন্তের কোকিল গণমাধ্যমের মুখগুলোকে সেদিন দেখা যায়নি। আজকের মতো এত সুবিধাবাদী আখের গোছানো মতলববাজ আওয়ামী লীগ তার পাশে ও দলে সেদিন দেখা যায়নি। আজ যতদূর চোখ যায় হাইব্রিড ও কাউয়ারা কা কা রব করে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ‘সুসময়ে বন্ধু বটে অনেকেই হয়, অসময়ে হায় হায় কেউ কারও নয়।’ দুঃসময় এলে ভাটার টানের মতো এরা চলে যাবে। ক্ষমতার জোয়ারে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকে ভোগ করতে মৌমাছি, মৌমাছি কোথা যাও নাচি, নাচি বলে, জোয়ারের জলের মতো এরা এসেছে। নানা বুদ্ধি, পরামর্শ আর জি-জাঁহাপনার চাটুকারিতায় চারপাশে কোরাশ গাইছে। দুঃসময়ে এরা কেউ নিরাপদে বিদেশে পাড়ি দেবে। না হয় নতুন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জলের মতো মিশে যাবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয় নিবেদন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে কালো ধারাগুলো দিয়ে গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে দেবেন না। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ভবিষ্যতে যারা আসবে তারা অপপ্রয়োগ করবে না সে গ্যারান্টি কোথায়? এ আইন সংশোধন করে গণমাধ্যমকে মুক্তি দিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিতে দিন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সংবিধান বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অবাধ মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে। বুক ভরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে দিয়েছে। এ অর্জন আমরা হারাতে চাই না। আপনাকে মানুষ ভালোবেসে গণতন্ত্রের মানসকন্যা বলে। গণতন্ত্রের বাতিঘর হয়ে জাতির জীবনে প্রজ্বলিত হয়ে থাকতে চাইলে শত ফুল ফুটতে দিতে হবে। সব মত-পথ নিয়েই পরমতসহিষ্ণু গণতন্ত্রের চর্চায় একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হৃষ্টপুষ্ট হয়। স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা যেমন পূর্ণতা পায় না, তেমনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও আলোকিত হতে পারে না। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সবিনয়ে করুন মিনতি করে বলছি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে গণমাধ্যম ও মানুষের সাংবিধানিক মত প্রকাশের স্বাধীন অধিকার কেড়ে নেবেন না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে একটি দারুণ নির্মোহ সত্য কথা বলেছেন। নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ করে বলেছেন, আত্মতুষ্টিতে থাকা বিপজ্জনক। প্রতিপক্ষকে শক্তিশালী মনে করে চলতে হবে। আত্মতুষ্টি মানেই পতন। মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আত্মতুষ্টির ও মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বড় খেসারত দিতে হয়েছে। দলীয় এমপিদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা থেকে বিরত থাকতে এবং দলাদলি পরিহার করে ঐক্যবদ্ধ থাকারও তাগিদ দিয়েছেন। এ কথা সত্য ১০ বছরের শাসন ক্ষমতায় সারা দেশে আওয়ামী লীগকে সরকারি দল ও বিরোধী দলের চেহারায় পরিণত করেছে। একদল ক্ষমতার দম্ভে সিন্ডিকেট করে দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীদেরই হতাশা করেননি, মানুষকেও ক্ষুব্ধ করেছেন। দুই হাতে টাকা লুটেছেন। দেশে বিদেশে বাড়ি-গাড়ি করেছেন। সম্পদে ও চলাফেরা নির্লজ্জ আস্ফালন দেখিয়েছেন। দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। মানুষের মনে আঘাত করেছেন। এদের সংখ্যা সীমিত। প্রতি জেলায় এদের সংখ্যা হবে ৫-১০ জন করে। কিন্তু দলটির হাজার হাজার নেতা-কর্মী নিবেদিতপ্রাণ রয়েছে। তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি নিঃশর্ত সমর্পণ করেছে। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনে এরা মনোনয়ন বাণিজ্যের শিকার হয়েছে। কমিটি গঠনে বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট তন্ত্রের শিকার হয়ে অভিমানে ঘরে উঠেছে। আদর্শবান নেতা-কর্মীরা দলের সঙ্গে বেইমানি না করলেও অভিমানে এখন নিষ্ক্রিয়। শেখ হাসিনার আশপাশে থেকে, দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে তাদের তুলে আনতে হবে।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ তৃণমূল থেকে ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতিতে পা দিয়েছেন। সততা ও ত্যাগের পথে জেল-জুলুম সয়ে জীবনের পরতে পরতে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে বিরোধী দলের উপনেতা, ডেপুটি স্পিকার, স্পিকার ও রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। এখনো তিনি তার হাওরের জনপদে যান। সহজ সরল নিরাবরণ জীবন নিয়ে গ্রামীণ বাড়িতে ঘুমান। হাওরের জনপদে রিকশায় চড়ে ঘুরেন। সাধারণের সঙ্গে মেশেন, সাধারণের সঙ্গে কথা বলেন। তার এলাকায় মানুষের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন, ‘এবারের নির্বাচনে এমপি-মন্ত্রী হয়ে যারা আখের ঘুছিয়েছে, দুর্নীতি করেছে তাদের জনগণ যাতে ভোট না দেয়। এমনকি তার সন্তান হলেও নয়।’ আওয়ামী লীগ গরিবের দল, বঙ্গবন্ধু গরিব পরিবার থেকে আসা নেতা-কর্মীদের এমপি-মন্ত্রী বানিয়েছেন। শেখ হাসিনা ৯১ সাল পর্যন্ত সেই ধারা রক্ষা করলেও প্রতিপক্ষের অসুস্থ প্রতিযোগিতার কাছে পারেননি। রাষ্ট্রপতি আজ মানুষের বুকের ভাষায় উচ্চারণ করেছেন। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার কাছে নিবেদন, আওয়ামী লীগে হাজার হাজার মেধাবী, শিক্ষিত, ভদ্র, সৎ, বিনয়ী নারী-পুরুষ রয়েছে। তাদের টেনে আনুন। অসুস্থ প্রতিযোগিতার মঞ্চের বাইরে তারা ছিটকে পড়েছে। চলমান প্রতিযোগিতার মঞ্চে তাদের দেখা যাচ্ছে না। বিতর্কিত, সন্ত্রাসী, লুটেরা, দুর্নীতিবাজদের মনোনয়ন দেওয়া দূরে থাক, দলের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিন। আদর্শিক নেতৃত্ব, আদর্শিক দল ও আদর্শিক রাজনীতি গণমুখী চরিত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের সরল কথায় বললে, জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর সাহস, সততা ও নির্লোভ রাজনীতির উত্তরাধিকারিত্ব দেখতে চাই। সেভাবেই আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দিন।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

পীর হাবিবুর রহমান