• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

আওয়ামী লীগের ব্যর্থতায় জম্ম ড. কামালের ফ্রন্ট

প্রকাশ:  ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০১:১৭
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় রাজনীতিতে দুটি ধারার মেরুকরণ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় নির্বাচনী ট্রেন মার্চের পর সড়ক অভিযানও শুরু করেছে। এরশাদের জাতীয় পার্টি যে আওয়ামী লীগের মহাজোটের প্রধান শরিক হয়েই ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে তাও প্রায় দৃশ্যমান। সংসদের অফিসকক্ষে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেছেন। নির্বাচনী ঐক্য চূড়ান্তই ছিল বৈঠকের মূল এজেন্ডা।

এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে টানা ১০ বছর ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য যেমন স্বর্ণযুগই নয়, দারুণ সুসময় চলছে, তেমনি বিএনপির জন্য গত এক যুগ ধরে রাজনীতিতে অন্ধকার যুগই নয়, কঠিন দুঃসময় বইছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় কারাগারে। নির্বাচনের আগে তার মুক্তি দূরে থাক, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কিনা, সেটিই মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু বিএনপির নির্বাসিত দন্ডিত এবং নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে বসে এবারের ভোটযুদ্ধ সামনে রেখে দলের সব কাজ মনিটর করছেন, প্রার্থীদের ভোটের মাঠে নামিয়ে দিচ্ছেন।

অতীতের সব হঠকারী উগ্রপন্থার সহিংস রাজনীতির পথ পরিহার করে বিএনপি সরকারবিরোধী জনমতকে পক্ষে নিয়ে ভোট লড়াইয়ে শামিল হওয়ার কৌশল নিয়েছে। শুধু তাই নয়, ক্রান্তিকাল অতিক্রম করতে গিয়ে অতীতের অন্যায়ের জন্য দলের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিকল্পধারার অধ্যাপক বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরীর কাছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নেতারা ক্ষমাও চেয়েছেন। এমনকি কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে বিএনপির সিনিয়র নেতারা গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্যের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে দেখা করে আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও আন্দোলন প্রশ্নে নীতিগত রূপরেখা প্রণয়নের একক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এমনকি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি থাকলেও সাংগঠনিক গণভিত্তি নেই জেনেও ড. কামাল হোসেনের ব্যক্তিত্বের ভারের কাছে, ইমেজের কাছে বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েই ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। সেই জাতীয় ঐক্যের একটি সমাবেশ সম্প্রতি মহানগর নাট্যমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ড. কামাল হোসেন ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সরকারের প্রতি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আলোচনায় বসার আলটিমেটাম দিয়েছেন। বিএনপিসহ অন্য দলের নেতারা বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর রাজনৈতিক বক্তৃতা করেছেন। সেই মঞ্চে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে উপস্থিত ছিলেন গণফোরাম নেতা মোস্তফা মহসীন মন্টু, অ্যাডভোকেট সুব্রত রায়, প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহীদ উল্ল্যাহ, গণস্বাস্থ্যের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, যুক্তফ্রন্ট থেকে প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করেছিলেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরী। বক্তৃতা করেছেন জেএসডির সভাপতি স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তৃতাই করেননি, তিনি দলের নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আবদুল মঈন খানকে নিয়ে মঞ্চে ওঠেন। সেই সমাবেশের আগের রাতে বিএনপি নেতারা তাদের নির্বাচনী রূপরেখা ও লিখিত বক্তব্য তুলে দিয়ে ড. কামালকে বলেছিলেন, আপনি সংবিধানপ্রণেতা ও জাতীয় মুরব্বি, যে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি নেবেন তাতেই আমাদের সমর্থন থাকবে। একই সঙ্গে তারা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং বিএনপি নেতা-কর্মীদের নামে যে গায়েবি মামলা হচ্ছে এবং ধরপাকড় চলছে তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে দায়ের করা রিট মামলায় এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির আইনি লড়াইয়ে অংশগ্রহণের অনুরোধ করেন। সেই সমাবেশে সব দলের নেতা-কর্মী অংশ নিলেও বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর ঢল নেমেছিল। বাম গণতান্ত্রিক জোট ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত না হলেও তাদের নেতা জোনায়েদ সাকী সেই মঞ্চে উঠে বক্তৃতা করেছেন।

এ ঐক্য প্রক্রিয়ার মঞ্চে আবির্ভাব নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে চায়ের টেবিলে নানা মহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল ঝড় বইছে। সরকারি দলের নেতারা একে সাম্প্রদায়িক শক্তির ঐক্য বলেছেন। তারা অধ্যাপক বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরীর ওপর বিএনপি শাসনামলে বঙ্গভবন থেকে বের করে দেওয়াসহ তার ওপর হামলার চিত্র তুলে ধরেছেন। এমনকি প্রথমে স্বাগত জানালেও এখন দুর্নীতিবাজ, খুনি ও ষড়যন্ত্রকারীদের ঐক্য হিসেবে চিহ্নিত করে জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবকে সেনাশাসক এরশাদের গৃহপালিত বিরোধী দলের নেতা বলেও সমালোচনার তীরে ক্ষতবিক্ষত করেছেন। নিউইয়র্কে দেওয়া এক সংবর্ধনায় খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, সুদখোর, ঘুষখোর, খুনি ও দুর্নীতিবাজ সবাই এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতিবাজদের নিয়ে কামাল হোসেনরা এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়বেন। জনগণ তাদের ভোট দিলে দেবে। তবে এরা ক্ষমতায় গেলে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে মিলে দেশকে ধ্বংস করবে। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের দেওয়া সংবর্ধনায় শেখ হাসিনা এ মন্তব্য করেন।

ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে সারা দেশে যে সংগঠন করতে পারেননি এবং তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে কখনো যে জিততে পারেননি, তাও যেমন জনগণের সামনে তুলে ধরছেন, তেমনি যুক্তফ্রন্টের সব শরিকেরই যে সাংগঠনিক শক্তি নেই, তা উল্লেখ করতেও ভুলছেন না সরকরি দলের নেতারা। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি তৃণমূল পর্যন্ত যার জনপ্রিয়তা রয়েছে তারা এ ঐক্যের মধ্য দিয়ে স্টধু হালে পানিই পায়নি, ভোটযুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার নতুন প্রাণশক্তি অর্জন করেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তৃতায় পরিষ্কার হয়ে উঠেছে এ ঐক্যকে তারা কতটা গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন। এদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সরকারবিরোধী এ ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে যে জনগণের প্রত্যাশিত একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী সরকার ও শক্তিশালী বিরোধী দলের সমন্বয়ে প্রাণবন্ত কার্যকর ও নেতৃত্বের অলঙ্কারে সমৃদ্ধ সংসদ জাতির সামনে আসবে তা নিয়ে আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছে।

ঐক্য প্রক্রিয়ার সমাবেশে ড. কামাল হোসেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি যেমন চাননি, তেমনি সরকারি মহলের অভিযোগের জবাবে বলেছেন, ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় কেউ কেউ ক্ষমতায় যাওয়ার ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন। আমরা প্রকাশ্যে সভা করছি, কোনো ষড়যন্ত্র করছি না। ব্যক্তিগতভাবে আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। জনগণের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের ভোট, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার আদায় করব। ঐক্যে জনগণ ব্যাপক সাড়া দিয়েছে। এ প্রচেষ্টা সফল হবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতির চরম দুর্দিনে মুক্তির পথ দেখানোর জন্য কামাল হোসেনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আসুন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে আন্দোলন শুরু করে সরকারকে বাধ্য করি খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দীর মুক্তি দিতে এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে। তিনি নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ সরকার গঠন ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানান। এ বক্তব্য এখন ড. কামাল হোসেনেরও। অধ্যাপক বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরী বলেন, আমরা মুক্ত গণতন্ত্র চাই। এ সরকারের পতন চাই। সব রাজবন্দীর মুক্তি চাই। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ও ইসলামী ঐক্যজোটের নেতারা মঞ্চে ছিলেন।

২০-দলীয় জোটের শরিক এলডিপির সভাপতি কর্নেল অলি আহমদ (অব.) ও কল্যাণ পার্টির মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম (অব.) বীরপ্রতীক সভায় যাননি। কর্নেল অলি আহমদ এর আগে ড. কামাল হোসেনদের গণবিচ্ছিন্ন বলে নেতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম সেদিন মঞ্চে না গেলেও পরবর্তীতে যুক্ত হবেন বলে জানিয়েছেন এমন বক্তব্য ঐক্য প্রক্রিয়া নেতাদের। তবে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক শক্তিনির্ভর এবং যুক্তফ্রন্ট নেতাদের ইমেজনির্ভর এই সরকারবিরোধী ঐক্য আদর্শিক জায়গা থেকে এখনো সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়।

আওয়ামী লীগ নেতারা এদের নিয়ে যতই সমালোচনা করুন না কেন পঁচাত্তর-উত্তর কঠিন নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে পতিত আওয়ামী লীগ খুনি মোশতাকের অবৈধ সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জেনারেল ওসমানীকে ’৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জোট প্রার্থী করে রাজনীতির ময়দানে আবির্ভূত হয়েছিল। খুনি মোশতাকের উপদেষ্টা পদ গ্রহণ ছাড়া জেনারেল ওসমানীর ইমেজ ছিল ক্লিন, সাহসী, পরিষ্কার ও বীরত্বের। তার জš§দিন বা মৃত্যুদিনে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ তাকে স্মরণ না করলেও সেই দুঃসময়ে তাকেই প্রার্থী করেছিল। ’৭০ সালের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু তাকে আওয়ামী লীগে এনে এমএলএ নির্বাচিত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত হয়েছিল। গোঁফের আড়ালে প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ওসমানী একদলীয় বাকশালের বিরোধিতা করে সংসদ থেকে পদত্যাগই করেননি, আমৃত্যু সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য লড়েছিলেন।

আজকে আওয়ামী লীগ নেতারা আ স ম রবকে সেনাশাসক এরশাদের গৃহপালিত বিরোধীদলীয় নেতা বললেও ’৯৬ সালে জাতীয় পার্টি ও রবের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিল। আ স ম রবকে মন্ত্রী করার পর সেই আজকে আনা অভিযোগ নৈতিক দিক থেকে কতটা যৌক্তিক সেই প্রশ্ন উঠে আসে। অন্যদিকে ২০০১ সালের বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে কঠিন নিপীড়নের মুখে পতিত আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক শক্তিহীন নেতাসর্বস্ব বামপন্থিদের নিয়ে ১৪ দলই করেনি, এরশাদের জাতীয় পার্টিকে ও বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসা বি চৌধুরী ও কর্নেল অলিদের নিয়ে মহাজোট গঠন করে পল্টনে জনসমুদ্র করেছিল। সেদিন নির্বাচন ও সরকার গঠনের জন্য এরশাদকে রাষ্ট্রপতি করার অঙ্গীকার করেও আওয়ামী লীগ চুক্তি করেছিল।

ক্ষমতার রাজনীতিতে অতীতে আওয়ামী লীগ যে হিসাবের পথে হেঁটেছে এবার বিএনপি ও অন্যরা সে হিসাবের পথ নিয়েছে। ড. কামাল হোসেন ইতিমধ্যে বলেছেন, জামায়াতকে নিয়ে ঐক্য করার প্রশ্নই আসে না। অধ্যাপক বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরীও বলেছেন, পরোক্ষভাবেও জামায়াত থাকবে না। এ কথা কেউ অস্বীকার করবে না যে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জনগণের শক্তিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রায় ৩৮ বছর রাজনীতিতে তার প্রজ্ঞা, মেধা, সাহস ও লড়াই দিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাতিঘর হয়ে আছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক শক্তি হলেও মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির এরশাদ সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামই আনেননি, ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতিতেও বিশ্বাস করেন। অন্যদিকে বিএনপি জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতিতে যেমন বিশ্বাস করে, তেমনি ড. কামাল হোসেনসহ ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত বাকি দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেই লালন করে।

নির্বাচন কমিশন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে। জামায়াত রাজনৈতিকভাবে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার ক্ষমতা হারিয়েছে। যদিও রাজনৈতিক দল হিসেবে এখনো তারা নিষিদ্ধ হয়নি। একই সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের প্রধান শরিক হিসেবে রয়েছে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্তফ্রন্ট, বিএনপি তার শরিকরা যুক্ত হলেও বাম গণতান্ত্রিক জোট শেষ পর্যন্ত আসবে কিনা তা একটি বড় প্রশ্ন। মুক্তিযুদ্ধ, সৎ আদর্শিক রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে বাম গণতান্ত্রিক জোটের রাজনৈতিক ইমেজ পরিষ্কার। এখানে ঐক্যের আদর্শিক ঘোষণা সুমহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিএনপি কতটা লালন করবে? পাকিস্তানপ্রীতির যে অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে তার বিচ্ছেদ ঘটিয়ে কতটা পরিষ্কার করে জনগণের আস্থা অর্জন করবে? একাত্তরের পরাজিত সাম্প্রদায়িক শত্র“রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের প্রণয়ের যোগসূত্র নেই, তা যেমন পরিষ্কার করার প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি জামায়াতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করে অতীতে ঐক্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার করার কারণে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইবে কিনা এ দায়ও ঐক্যের নেতা হিসেবে ড. কামাল হোসেনকে নিতে হবে।

এ কথা সত্য, ঐক্য প্রক্রিয়া বা যুক্তফ্রন্টের রাজনৈতিক দলগুলোর সারা দেশে যে ভোট রয়েছে, জামায়াতের একটি নির্বাচনী এলাকায় সেই ভোট রয়েছে। কিন্তু জামায়াতের যে কালো ভাবমূর্তি তার বিপরীতে যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের উজ্জ্বল ইমেজ বা আস্থার জায়গা রয়েছে। ঐক্য প্রক্রিয়ার কাঠামো, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ঘোষণা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি কী হবে তা ঘোষিত না হওয়া পর্যন্ত জনমনের সংশয় যেমন কাটবে না, তেমনি সরকারি দলের নেতাদের অভিযোগ জোরেশোরে মানুষকে প্রভাবিত করার সুযোগ পাবে।

রাজনীতিতে প্রকাশ্যে বা আড়ালে যে যত দাবার খেলাই খেলুন না কেন, যে যত সাপ-মইয়ের লুডু খেলেন না কেন জনগণের আস্থা-বিশ্বাস ও শক্তির অগ্নিপরীক্ষার জায়গাটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির রাজনীতি। যে জায়গাটিতে আওয়ামী লীগ উত্তরাধিকারিত্ব নিয়ে সঙ্গীদের সঙ্গে করে দাঁড়িয়ে গেছে। ড. কামাল হোসেন বিএনপিসহ শরিকদের সেখানে পরিষ্কার অবস্থান নিয়ে দাঁড়াতে পারলে আর যদি বাম গণতান্ত্রিক জোটকেও সঙ্গে নিতে পারেন তাহলে জনগণের জন্য সুসংবাদ হচ্ছে, এবারের একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে সব দলের অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ-উত্তেজনা মাড়িয়ে ভোটযুদ্ধে সংঘটিত কিছু কিছু অনিয়ম ছাপিয়ে যে সংসদ আসবে সেখানে সরকার ও বিরোধী দল দুটোই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তি। এতে একটি জবাবদিহিমূলক, কার্যকর প্রাণবন্ত সংসদের মধ্য দিয়ে সুশাসন নিশ্চিত হতে পারে।

আওয়ামী লীগ নেতারা সরকারবিরোধী ঐক্য প্রক্রিয়ার মঞ্চ দেখে তির্যক বাক্যবাণে আক্রমণ করছেন, আর্তনাদ করছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ আয়নার সামনে দাঁড়ালে পরিষ্কার দেখতে পাবে তাদের ব্যর্থতার জন্যই ড. কামালের নেতৃত্বে আজকের সরকারবিরোধী ঐক্যফ্রন্টের মঞ্চ গঠিত হচ্ছে। এ মঞ্চ গঠনের নেপথ্যে যারা দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তাদের অন্যতম গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু, সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ, বিএনপি নেতা ও সাবেক ছাত্রলীগের সভাপতি মনিরুল হক চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক, সাবেক ডাকসু ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নার ভূমিকা অনন্যসাধারণ।

আওয়ামী লীগের ১৪ দলেও ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম ছিল। আওয়ামী লীগ চাইলে ড. কামাল হোসেন তাদের বাইরে যেতেন এমনটি মানুষ বিশ্বাস করে না। ওয়ান-ইলেভেনের সংস্কারের অভিযোগে দলীয় আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াননি এমন নেতা খুব কম রয়েছেন। কিন্তু সেদিন শাস্তির খড়্্গ হাতে গোনা কয়েকজনকে বহন করতে হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে অনেকেই মনোনয়ন পেয়েছেন, পরে মন্ত্রী হয়েছেন। দল ছেড়ে যাওয়া কেউ কেউ মেয়রও হয়েছেন। কিন্তু বগুড়ার মতো বিএনপির ঘাঁটিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির পাথরের ফুল ফোটানো সাবেক ডাকসু ভিপি মান্নাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, দলের ওয়ার্কিং কমিটিতেও রাখা হয়নি। অধ্যাপক আবু সাইয়িদের অবস্থা এখনো তাই। মেহেরপুরের সাবেক এমপি অধ্যাপক আবদুল মান্নানের ভাগ্যেও ঘটেছে একই পরিণতি।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঊনসত্তরের তোফায়েল আহমেদ সংসদ ও রাজপথ এবং কারাগারে বার বার হীরকখ-ের মতো প্রজ্বলিত হয়েছেন। তোফায়েল আহমেদের পর ডাকসু ভিপি হয়েছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সুলতান মনসুর। সুলতান ষাটের দশকে স্কুলজীবন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির পথ হেঁটে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন। সিলেটে দুটি কলেজের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এইচএসসিতে মেধা তালিকায় স্থান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে প্রতিরোধযুদ্ধে গিয়েছেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি থেকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে জোট প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নেমেছিলেন। দীর্ঘদিন ঘরে বসে ছিলেন। তাকে একবার বাংলাদেশ প্রতিদিনে আমি ও নঈম নিজাম দুপুরের খাবার খেয়ে ধৈর্য ধরে পড়ে থাকতে বললে তিনি বলেছিলেন, ছয় বছর আমাকে রাজনৈতিকভাবে কারাগারে রাখা হয়েছে, আর কত? সৎ, নির্লোভ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সাহসের পথ হাঁটা সুলতানের ইমেজ ছিল দলের ভিতরে-বাইরে সবখানে। সিলেটের রাজনীতিতে মরহুম আবদুস সামাদ আজাদ, দেওয়ান ফরিদ গাজী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পর তিনিই হবেন রাজনীতির কা-ারি এমন প্রত্যাশা ছিল সবার। নক্ষত্রের পতনই ঘটেনি, দলের কোথাও তাকে রাখা হয়নি, ডাকা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন। মোস্তফা মহসীন মন্টু ষাটের দশক থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পরও সব দুঃসময়ে দলের মাঠকর্মীদের কাছে অমিত সাহসের প্রতীক ছিলেন। এদের সবাইকে চাইলে আওয়ামী লীগ কাছে নিতে পারত। এমনকি বাম গণতান্ত্রিক জোট বিশেষ করে সিপিবিকে জোটে রাখা যেত। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম; যার বুকজুড়ে বাস করেন পিতার আসনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি রাজনীতির মঞ্চে যা-ই বলুন, ব্যক্তিগতভাবে যার সামনে এখনো কেউ শেখ হাসিনাকে নিয়ে কোনো সমালোচনা করতে পারেন না। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বে যিনি হয়েছিলেন বাঘা সিদ্দিকী। পঁচাত্তরের বিদ্রোহে যিনি বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের ইজ্জত রেখেছিলেন। সেই কাদের সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ চাইলে পাশে রাখত পারত।

এবারের নির্বাচনে আড়াই কোটি নতুন ভোটার। এ তরুণরা বেড়ে ওঠার সময় বিএনপি-জামায়াতের অভিশপ্ত শাসনামাল দেখেনি। আওয়ামী লীগের ১০ বছর দেখেছে। উন্নয়ন ও অন্যায় দর্শন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যুদ্ধাপরাধের বিচার সমর্থন করেছে। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলন ইস্যুতে সরকার ঠিকমতো সমাধান দিতে না পারায় আজ তরুণদের মনে কী ভাষা তা কি পড়তে পারছে? টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীর আনা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করায় এখন গণমাধ্যমকে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। শেখ হাসিনার হাত ধরে যে বেসরকারি টেলিভিশন অনলাইন সাংবাদিকতা ও তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব ঘটেছে সেখানে এ কালো আইনের কিছু ধারা সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। তা কি সরকারি দল বুঝছে?

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

পীর হাবিবুর রহমান