• বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮, ১ ভাদ্র ১৪২৫
  • ||

গুহাবন্দী সময়ের অভিজ্ঞতা শোনালো থাই কিশোররা

প্রকাশ:  ১৮ জুলাই ২০১৮, ২১:১৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রিন্ট

দু:সাহসিক অভিযানে থাইল্যান্ডের গুহা থেকে উদ্ধার হওয়া ১২ কিশোর ফুটবলার ও তাদের কোচ প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে এসেছেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর বুধবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন তারা। এসময় তাদেরকে বেশ উৎফুল্ল দেখা গেছে। সে দেশের প্রথাগত সম্ভাষণ ‘ওয়েই’ বলে তারা উপস্থিত সাংবাদিকদের স্বাগত জানান।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বুধবার থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ চিয়াংরাইয়ে উদ্ধারকৃত কিশোরদের সংবাদ সম্মেলনে হাজির করে কর্তৃপক্ষ। ‘ওয়াইল্ড বোর’ ফুটবল টিমের লাল-হলুদ জার্সি পরে তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

ফুটবল দলের ১৪ বছর বয়সী সদস্য আদুল স্যাম-অন তাদের খুঁজে পাওয়ার মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন, এটা ছিল 'অলৌকিক মুহূর্ত'। ব্রিটিশ ডুবুরিরা যখন তাদের গুহার অন্ধকার উঁচু এক ঢিবিতে খুঁজে পান তখন প্রথমে এই ঘটনাকে বিশ্বাস করতে পারেননি কিশোররা।

কিশোররা বলেন, গুহায় আটক থাকাকালীন সময় পার করার জন্য তারা হপ-স্কচ খেলার চেষ্টা করেন। ১০ দিনের আটকাবস্থার সময় গুহা থেকে বের হয়ে আসার জন্য তারা পথ খোঁজার চেষ্টাও করেন।

উদ্ধার অভিযানের সময় থাই নেভি সিলের এক সদস্য অক্সিজেন সঙ্কটে মারা যান। তার প্রতি ও উদ্ধারকারীদের সম্মান জানাতে এই কিশোরদের কয়েকজন ভবিষ্যতে নেভি সিলের সদস্য হওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

কোচ এবং দলের সদস্যদের পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন স্যাম। ব্রিটিশ ডুবুরিরা যখন তাদের কাছে পৌঁছায় সেই সময়ের কথা স্মরণ করে স্যাম বলেন, প্রথমে আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে, এটি সত্যি। আমরা ভয়ে ছিলাম; তারা দ্রুত আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। এজন্য অামি তাদের 'হ্যালো' বলেছিলাম।

স্যাম বলেন, আমি প্রথমে তাদের কাছে থেকে হ্যালো শব্দটি শুনতে পেয়েছিলাম; কিন্তু তাদের দেখতে পাইনি। আমরা তাদের এগিয়ে আসার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম; কারণ তারা পানিতে সাঁতার কেটে আসছিল। তারা কিছু একটা বলছিল।

'আমি মনে করেছিলাম তারা থাই কর্মকর্তা কিন্তু যখন তারা পানি থেকে উঠে আসে তখন বুঝতে পারি যে, তারা ইংরেজ। আমি বুঝতে পারছিলাম না কী বলবো। সে জন্য হ্যালো বলেছিলাম।'

'এটা ছিল অলৌকিক, আমি অবাক হয়েছিলাম। আমার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক করছিল, কখন আমরা বাইরে যেতে পারবো। এরমাঝে তিনি জানতে চান, আমরা কেমন আছি। আমি বলেছিলাম, আমরা ঠিক আছি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমি কী তোমাকে সাহায্য করতে পারি? তিনি বলেছিলেন, না, ওপরের দিকে যাও।'

'তারা জানতে চেয়েছিল, তোমরা কতজন? আমি বলেছিলাম, ১৩ জন। তারা বলেছিলেন, দুর্দান্ত।'

গণমাধ্যমে গুহায় আটকা থাই কিশোররা সাঁতার জানেন বলে জানানো হলেও তাদের কোটচ একাপ্পল চ্যান্তাওং বলেছেন, ছেলেরা সাঁতার কাটতে জানে। তারা আটকা পরার আগে কখনোই গুহায় যায়নি। কিন্তু অতীতে অনলাইনে গুহায় যাওয়ার ছবি পোস্ট করেছিলেন এই কোচ।

তিনি বলেন, পানি বাড়ায় প্রথমে তারা বুঝতে পারেন যে আটকা পড়তে যাচ্ছেন। প্রথম দিকে কেউ ভয় পায়নি। কারণ তাদের ধারণা ছিল, দিনের শেষে পানি কমে যাবে এবং উদ্ধারকারীরা চলে আসবেন। কিন্তু তিনি যখন বুঝতে পারলেন পানি কমার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তখন যে জায়গায় আটকা ছিল তার পেছনের দিকে পথ খোঁজার জন্য কিশোরদের নির্দেশ দেন তিনি। তার ধারণা ছিল, পথ খুঁজে পেলে দঁড়ি বেয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়া যাবে।

শরীরে শক্তি সঞ্চয়ের জন্য গুহায় আটকাবস্থার সময় উইল্ড বোর ফুটবল দলের এই কোচ কিশোরদের ধ্যানের অনুশীলন করিয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান।

এর আগে বুধবার ১২ কিশোর ফুটবলার ও তাদের কোচকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। টানা ৮ দিনের নীবিড় পরিচর্যা শেষে তাদেরকে পুরোপুরি সুস্থ ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তিনটি মিনিবাসে চড়ে উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ চিয়াং রাই প্রদেশের ওই হাসপাতাল ত্যাগ করেন তারা।

এসময় তারা ফুটবল ‘কিটস’ পরা ছিলেন। স্থানীয় একজন সাংবাদিক বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই তাদের ছেড়ে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার হওয়ার পর থেকে কর্তৃপক্ষের কঠোর বিধি-নিষেধের কারণে তাদের নাগাল পাননি সংবাদকর্মীরা। বুধবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন শেষে তারা নিজ বাড়িতে ফেরার কথা রয়েছে। থাইল্যান্ড সরকারের মুখপাত্র সুনসার্ন কায়েকুমনার্ড বলেন, গণমাধ্যমকে তাদের অভিজ্ঞতা সরাসরি জানানোর জন্য সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। এর পর তারা আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন।

প্রায় ২ সপ্তাহ গুহার গহীনে কাটানোর ফলে তাদের ওপর কোন বিরূপ প্রভাব পড়েছে কিনা, সংবাদ সম্মেলনে সে বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে একটি পর্যবেক্ষণকারী দল। কোন উদ্ভট প্রশ্নে যেন কিশোররা বিব্রত না হন, সে জন্য পূর্বে থেকেই সংবাদ মাধ্যমগুলো থেকে প্রশ্ন আহবান করে কর্তৃপক্ষ। পূর্বে জমা দেয়া এসব প্রশ্ন মনোবিদদের দিয়ে পর্যালোচনা করে তা কিশোরদের কাছে উত্থাপন করা হয়। এছাড়া সরাসরি কোন অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে বিড়ম্বনা সৃষ্টি না করার জন্য সাংবাদিকদের নির্দেশনা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি কমপক্ষে এক মাস কোন সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেয়ার জন্য কিশোর ফুটবলারদের পরিবারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে তাদের মানসিক চিকিৎসা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৩ জুন থেকে গুহায় উইল্ড বোর ফুটবল দলের ১২ কিশোর সদস্য ও তাদের কোচ আটকা ছিলেন। ২ জুলাই ৯ দিনের এক অভিযানের পর দুই ব্রিটিশ ডুবুরি গুহার ভেতরে কিশোর ফুটবল দলের সদস্যদের খুঁজে বের করেন। দীর্ঘ প্রায় ৪ কিলোমিটার সংকীর্ণ ও উঁচু-নিচু জলমগ্ন পথ পাড়ি দিয়ে কিশোরদের উদ্ধারে শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শুরু হয়।

প্রথম দিকে থাই কর্তৃপক্ষ জানায়, গুহায় বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় ও বর্ষা মৌসুমে বর্ষণের কারণে তাদের এখনই উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। আগামী ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের উদ্ধারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

কিন্তু ৮ জুলাই নাটকীয়ভাবে বন্যার পানি কিছুটা কমে যাওয়ায় এবং বর্ষণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উদ্ধার মিশনের প্রধান ও চিয়াং রাই প্রদেশের গভর্নর ন্যারংস্যাক ওসোত্তানাকর্ন জানান, কিশোরদের উদ্ধারে এখনই উপযুক্ত সময়। ওই দিন প্রথম দফায় চারজন ও পরদিন দ্বিতীয় দফায় চারজনকে উদ্ধার করা হয়। কোচসহ বাকি চারজনকে ১০ জুলাই বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা।

চিয়াং রাই প্রদেশের গুহায় আটকা ১২ কিশোর ফুটবলার ও তাদের কোচকে উদ্ধারে ১৩ বিদেশি ডুবুরি ও থাইল্যান্ডের নৌবাহিনীর অভিজাত শাখা থাই নেভি সিলের পাঁচ সদস্য কাজ করেন। এছাড়া গুহার ভেতরে ও প্রবেশ পথে আরো অন্তত ৯০ জন ডুবুরি উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত ছিলেন। তবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে অক্সিজেনের অভাবে থাই নেভি সিলের সাবেক এক সদস্য গুহার ভেতরে মারা যান।

-একে

থাইল্যান্ড,গুহা