• রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫
  • ||

প্রতারকদের জালে বাংলাদেশ

প্রকাশ:  ২০ জুন ২০১৮, ০০:৩৫
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট

ঈদে ফাঁকা হয়ে যাওয়া ঢাকায় ছুটি শেষ হতেই মানুষ ফিরতে শুরু করেছে প্রান্তিক থেকে। কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছে ফের ঢাকা। নাড়ির টানে ঢাকা ছেড়ে ঈদের ষোলোআনা সুখ নিতে পরিবার-পরিজনসহ মানুষ ছুটে গিয়েছিল পৈতৃক বাড়িতে। ঈদের উৎসবে ঢাকায় জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুরাও এ নগরীতে কোনো আনন্দ পায় না। দাদু বাড়িই হোক আর নানু বাড়িই হোক ঈদের খুশিকে মহাখুশিতে পরিপূর্ণ করে তারাও মা-বাবার সঙ্গে ছুটে চলে ঢাকার বাইরে। জেলা শহর থেকে গ্রাম যেখানেই পূর্ব পুরুষের ভিটেমাটি, সেখানেই ছুটে যায় মানুষ।

জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসা যে মানুষ উদয়াস্ত হাঁড় ভাঙা পরিশ্রম করে দিন এনে দিন খায় সে-ও ছুটে যায় গ্রামের পথে ঈদের আনন্দে।

সমস্যাকবলিত ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে ভালো-মন্দে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ঈদের আনন্দ উপভোগ করলেও একদল ভাসমান এবং ছিন্নমূল শিশু, নারী ও পুরুষ ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকে। মানবিক মানুষদের এবারও তাদের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে।

যাক মানুষ নির্বিঘ্নে ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেছে, ঈদের আনন্দ প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ছুটি শেষে ফের কর্মস্থলে ফিরে আসছে। এটা বড় সুখবর। ঈদের আনন্দ অকাল বন্যায় মৌলভীবাজারসহ কিছু জেলায় ভেসে গেছে। মনু নদী মৌলভীবাজারের দুঃখ বলেই পরিচিত। শহর-গ্রাম প্লাবিত করে এবারও ঈদের সুখ কেড়ে নিয়েছে।

মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরের আগে এক মাস পবিত্রতার সঙ্গে সংযম, নামাজ, রোজা ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে সবাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টায় মগ্ন থাকেন। সব লোভ-লালসা, পাপাচার থেকে বিরত থাকতে সংযমের মাস রমজান তাগিদ দিয়ে থাকে। বঙ্গভবন থেকে গণভবন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, রাজনৈতিক দলসহ সামাজিক পেশাজীবী সংগঠন রমজান মাসজুড়ে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। ধনী-গরিব-এতিমই নয়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে সম্প্রীতির উষ্ণ বন্ধন সৃষ্টি করে থাকে। ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও ইফতার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। রমজান মাসটি ছিল ইফতার মাহফিলের মাধ্যমে সবার সম্প্রীতির এক মিলনমেলা।

বেশ কয়েক বছর পর এবার বেশ কিছু ইফতার মাহফিলে যোগদান করায় সবার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে। ঢাকায় কখনো ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারিনি। আমার পূর্ব পুরুষের ভিটেমাটি জলজোছনার শহর সুনামগঞ্জে এখনো বাড়িতে বসে থাকলেও ঈদের আনন্দ আবেগ-অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করতে পারি। হাওরের রাজধানী কবিতা, গান ও প্রেমের শহর সুনামগঞ্জের বাইরে যতবার ঈদ করেছি, দিনটি আমার কাছে নিরানন্দই নয়, বিষাদময় লেগেছে। সুনামগঞ্জে এখন মুষলধারে বৃষ্টি নামছে। বৃষ্টির সন্ধ্যায় একা বাড়ির বারান্দায় চুপচাপ বসে থাকতে যে সুখ পাই তা প্রকাশ করার মতো অনুভূতি আমার নেই। ঈদে বাড়ি গেলে ছেলেবেলার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন অনেকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎই নয়, আড্ডায় আড্ডায় সময় কাটে অতি দ্রুত। সেসব আড্ডা জীবনীশক্তি বাড়িয়ে দেয়।

গেল বছর ঈদের আগের রাতে বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়। পরদিন বিমানে উড়ে ঢাকায় ফিরে আসি ভয়ে। এবারও ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতায় বাড়ি যাওয়া হয়নি আমার। ঈদের নামাজ পড়ে লম্বা ঘুম, বিকালে আমার মেয়ে চন্দ্রস্মিতাকে নিয়ে বাইরে ঘুরে এসে সন্ধ্যায় একটি ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে হাজিরা দিয়েই বিশ্বকাপ ফুটবলের দর্শক হিসেবে টিভি পর্দার সামনে বসি। আমাদের তারুণ্যে সেই কি তুমুল উত্তেজনার বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ভক্ত হয়ে আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছিলাম। মেসি কিংবদন্তি হয়ে এলেও ভক্তদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। এবারের বিশ্বকাপেও মেসি পেনাল্টি শটে ব্যর্থ হওয়ায় আর্জেন্টিনার মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে ড্রয়ের ফলাফলে রুখে দিয়েছে আয়ারল্যান্ড। পেরু ভালো খেললেও একটি সুযোগ কাজে লাগিয়ে জিতে যায় ডেনমার্ক। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানদের উত্তেজনাপূর্ণ খেলায় হারিয়ে দিয়েছে মেক্সিকো।

পর্তুগালের রোনালদো দেখিয়ে দিয়েছেন প্রথম দিনে তিনিই সেরা। স্পেনকে একাই তিন গোল দিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিকই করেননি, ড্রয়ের ফলাফলে আটকে দিয়েছেন। স্পেনের বিরুদ্ধে যেন সেদিন ফুটবল বিস্ময় রোনালদো একাই খেলেছেন। ব্রাজিলের মতো আরেক বিশ্বকাপ জয়ী দল তার অসংখ্য ভক্তের স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় দগ্ধ করে ড্র করেছে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে। ফুটবল দুনিয়ায় যেখানে সুইজারল্যান্ডকে গোনায় ধরে না, সেখানে ব্রাজিলকে রুখে দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে ফুটবলে অঘটন এমন করেই হয়। তিন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মান, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার খেলা দেখে হতাশ ফুটবল দুনিয়া। এবারের বিশ্বকাপে হয়তো আরও অনেক চমক ও অঘটন অপেক্ষা করছে। হয়তো বা সেরাদের মাঠের বাইরে পাঠিয়ে নতুন শক্তির আবির্ভাব ঘটতে পারে বিশ্বকাপ শিরোপার লড়াইয়ে। ফুটবল বিশ্বকাপের শুরুতেই ফলাফল হিসাব পাল্টে দিচ্ছে। ফুটবল দুনিয়ায় চলছে নতুন হিসাব-নিকাশ। এক সময় বিশ্বকাপ ফুটবলে একেকটি দেশ মাঠে যেমন ছিল দাপুটে তেমনি ছিল তারাকাদের ছড়াছড়ি। এবার বিশ্বকাপ সেদিক থেকে অনেকটাই ধূসর।

তবু ফুটবল-জ্বরে আক্রান্ত এখন গোটা দুনিয়া। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললে কী হবে! এ দেশের ফুটবলপ্রেমী মানুষের উন্মাদনা সব বয়সেই লক্ষণীয়। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন দোরগোড়ায়। সেখানে ভোটের উৎসব চলছে। ভোটের লড়াই থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল দৃষ্টি কেড়েছে দেশের মানুষের। সিলেট, রাজশাহী ও বরিশালে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আলোচনাও তলিয়ে গেছে বিশ্বকাপ ফুটবল-জ্বরে। এমনকি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাসও যেন ভুলতে বসেছে সবাই। ঈদের আগে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কোথায় হবে— এ নিয়ে যে টানাপড়েন তাও আলোচনায় নেই। সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে সিএমএইচে চিকিৎসার কথা বললেও বিএনপি অনড় ইউনাইটেডে! বুঝিনা খালেদা জিয়া অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা আগে জরুরি। আর ইউনাইটেড থেকে তো সিএমএইচের চিকিৎসামান অনেক উন্নত তা হলে আপত্তি কেন?

‘মাদকের বিরুদ্ধে, চলো যাই যুদ্ধে’ মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের আলোচনাও কদিন আগে ছিল শীর্ষে। এখন সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল চায়ের টেবিলে তুফান তুলেছে। এ তুফানে ঈদের আগে ঘটে যাওয়া দুটি বিখ্যাত জনপ্রিয় বিউটি পার্লার বা সেলুনের নীতিহীন অসৎ ব্যবসার উন্মোচিত কুিসত চেহারাও ভুলতে বসিয়েছে। মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত আধুনিক ফ্যাশন সচেতন বা রূপচর্চা সচেতন নারী-পুরুষদের প্রিয় বিউটি পার্লার বা সেলুনের নাম হচ্ছে পার্সোনা ও ফারজানা শাকিল। বিউটিশিয়ান কানিজ আলমাস খান ও ফারজানা শাকিল বাইরে পড়াশোনা করে দেশে যুগলবন্দী হয়ে রূপচর্চার প্রতি নারীর যে চিরন্তনী আকাঙ্ক্ষা সেটি লালন করে বিউটি পার্লারের ব্যবসা শুরু করেছিলেন।

কিন্তু নিজেদের অতি মুনাফা ও স্বার্থপরতার মোহ দুজনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পার্সোনা হয়ে যায় কানিজ আলমাস খানের। অন্যদিকে ফারজানা শাকিল উদ্যোক্তা নিজের নামেই প্রতিষ্ঠা করেন। দুটিই পার্লারই জনপ্রিয়তায় শীর্ষে ওঠে। সমাজে কানিজ আলমাস খান ও ফারজানা শাকিলের বিউটিশিয়ান হিসেবে এবং নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ইমেজই তৈরি হয়নি, সমাজের ওপর মহলে শক্তিশালী নেটওয়ার্কও তৈরি হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নারীদের আস্থা-বিশ্বাস ও ভালোবাসার সঙ্গে প্রতারণা করে অধিক মুনাফার লোভে নীতিহীন ও অসত্ভাবে তারা ব্যবসা চালিয়ে এসেছিলেন। যারা সেখানে রূপচর্চায় যেতেন তাদের বলা হতো বিদেশি মূল্যবান প্রসাধনী ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই অনুপাতে গলাকাটা দামও আদায় করা হতো। পার্লারে কর্মরতদের বাইরের দেশ থেকে ট্রেনিং দিয়ে আনা হয়েছে এমনটিও বলা হতো। সেটির সত্যতাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

ঈদের আগে সংযমের মাস রমজানের শেষ প্রান্তে ভ্রাম্যমাণ আদালত কানিজ আলমাস খানের পার্সোনায় নিম্নমানের নকল প্রসাধনী ব্যবহার হাতেনাতে ধরে চার লাখ টাকা জরিমানা করে। ফারজানা শাকিলকে একই অভিযোগে দুই লাখ টাকা জরিমানা দেয়। পশ্চিমা দেশে হলে সঙ্গে সঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করে দেওয়া হতো। আমাদের এখানে বিউটি পার্লারই নয়, নামকরা রেস্তোরাঁ, খাবার দোকান ও খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালত যায়, হাতেনাতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বাসি খাবারসহ নানা অনিয়ম ধরে জরিমানা দেয়। পশ্চিমা দুনিয়ায় আইন ও বিধি-বিধান সামান্য লঙ্ঘিত হলে বা ব্যবসার শর্ত সামান্য লঙ্ঘিত হলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে মালিককে আদালতের কাঠগড়ায় বিচারের সম্মুখীন করে।

দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির দুয়ারে আমরা। মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রতারণা কমেনি, বেড়েছে। যেনতেন উপায়ে অসত্ভাবে, নীতিহীন পথে আইন-কানুন লঙ্ঘন করে রাতারাতি দুই হাতে টাকা কামানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য শ্রেণি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দেশের মানুষের সঙ্গে নির্দ্বিধায় সর্বক্ষেত্রে প্রতারণার উল্লাস নৃত্যে নেমেছে। আইনের কাছে দায়বদ্ধ নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে দায়বদ্ধ নয়, এমনকি যেন নিজেদের বিবেকের কাছেও দায়বদ্ধও নয় তারা।

দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি প্রতারক গোষ্ঠী লুটপাটের নজির সৃষ্টি করেছে। একটি গোষ্ঠী প্রতারণার পথে ব্যাংকই লুট করে নিয়ে যাচ্ছে না, আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। একটি গোষ্ঠী দফায় দফায় প্রতারণা করে শেয়ারবাজার লুট করে নেওয়ার পর আর শেয়ারবাজার আজ পর্যন্ত দাঁড়াতে পারেনি। শেয়ারবাজারের করুণ বিপর্যয় রোজ গণমাধ্যমে ওঠে আসছে। আর বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। ইয়াবা ও মাদকের মতো মরণ নেশায় একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী দেশের তরুণ সমাজকে অন্ধকার নেশার রাজ্যে ঠেলে দিয়েছে। একটি প্রজন্মকে বাঁচাতে সরকার এ মরণ নেশা ইয়াবা ও মাদকের বিরুদ্ধে জনসমর্থন নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে।

মূল্যবোধহীন অবক্ষয়ে পতিত সমাজে দেশজুড়ে খাদ্যে ফরমালিন ও ভেজালের মাত্রা রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। মানুষের জীবনকে তুচ্ছ করে দিয়ে রাষ্ট্রের সব অর্জনকে ম্লান করে দিতে সর্বক্ষেত্রে একটি প্রতারক গোষ্ঠী অসত্ভাবে বিত্তবৈভব গড়তে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। খাদ্যে প্রতারণার চিত্র ভয়াবহ। স্বাস্থ্য খাতের মতো একটি প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষা খাত নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শেষ নেই। সরকারি খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাটে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবা নয়, স্বাস্থ্য বাণিজ্যের রমরমা দৃশ্যপট মানুষকে অসহায় করে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতের প্রতারণার কারণে জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। ভুয়া প্রতারক চিকিৎসক ও ধরা পড়ছে বিভিন্ন সময়।

ইউনাইটেড হাসপাতালের মতো অত্যাধুনিক বেসরকারি হাসপাতালে যেখানে মানুষ ব্যয়বহুল চিকিৎসা করাতে কার্পণ্য করে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত রোগীদের মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ খাওয়ানোর অভিযোগে তাদের ২০ লাখ টাকার জরিমানা করেছিল। এ ঘটনার পর মানুষের স্বাস্থ্যসেবার বিপরীতে এমন অসৎ ব্যবসায়ী ও নীতিহীন ভুল চিকিৎসা এবং বাণিজ্যের বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, এরা একেকজন জল্লাদ। আর হাসপাতাল যেন কসাইখানা। অথচ ইউনাইটেড হাসপাতালের মতো হাসপাতালে জাহাঙ্গীর আলমের মতো বিখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জন ও ড. মুমিনুজ্জামানের মতো বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট রয়েছেন। এ্যাপোলো হাসপাতালসহ বেসরকারি হাসপাতালগুলোর নির্দয় মুনাফা লোটার খবর অনেকবার গণমাধ্যমে এসেছে।

উচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে অনেক নির্দেশনা দিতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি বিল পরিশোধের জন্য লাশ আটকে রাখার মতো অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধেও। আমাদের গণমাধ্যম নিয়ে যতই সমালোচনা থাক না কেন, ক্যান্সারের মতো সমাজজুড়ে যে অসঙ্গতি, অন্যায়, অবিচার তা তুলে আনতে এখনো দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছে।

স্বাস্থ্য খাতের মতো শিক্ষা খাত নিয়েও সরকারি-বেসরকারি খাতে সংঘবদ্ধ প্রতারকরা লোভের লকলকে জিহ্বা নিয়ে মুনাফা লাভের নেশায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা যেমন সরকারি পর্যায়ে ঘটে, তেমনি বেসরকারি খাতে ডক্টরেটসহ উচ্চশিক্ষার রমরমা সার্টিফিকেট বিক্রির বাণিজ্য চলছে। শিক্ষাভবন নিয়ে এমন অভিযোগও রয়েছে যে, ঘুষ সেখানে গেট থেকেই শুরু হয়।

রাজনীতিতে একটি চক্র জনগণকে দেওয়া দল ও দলীয় প্রধানদের অঙ্গীকারের সঙ্গে নিয়ত প্রতারণা করে মানুষকেই নয়, নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদেরও ঠকিয়ে যাচ্ছে। এদের কাছে ক্ষমতার কমিটি বাণিজ্য থেকে স্থানীয় পর্যায়ের মনোনয়ন বাণিজ্য রমরমা হয়ে উঠেছে। এ সংঘবদ্ধ প্রতারকরা সরকারি দল, বিরোধী দল সব দলেই বাস করে। একজন গরিব পরিবারের সন্তানের কাছ থেকে সাধারণ একটি চাকরি থেকে তদবিরের নামে আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকে। নিয়োগ বাণিজ্য প্রতারকদের হাত ধরেই রমরমা হয়েছে। এরা মানব কল্যাণের পথ থেকে রাজনীতিকে রাজনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণের পথে নিয়ে এসে সিন্ডিকেট তন্ত্র চালু করে টেন্ডার হাট-মাঠ-ঘাট নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারি অফিস আদালত ঘিরে প্রতারকদের দৌড়ঝাঁপ নতুন নয়। এক সময় অভাবের তাড়নায় সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি থেকে প্রতারকদের জন্ম হতো। একালে নিচতলা নয় ওপরতলায় প্রতারণা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল, ধনাঢ্য, শিক্ষিত সমাজে প্রতিষ্ঠিতরাই এই প্রতারণা করছে।

সামগ্রিক চিত্র মিলিয়ে দেখলে গভীর ক্ষোভ বেদনার সঙ্গে বলতে হয়, প্রতারণার জালে বাংলাদেশ বা গোটা দেশ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এককালে পুরুষদের আধিক্য ছিল মানুষের সঙ্গে প্রতারণা এ জগতে। এখন পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও যুক্ত হচ্ছেন মুনাফা লাভের অসুস্থ সংস্কৃতিতে।

শুধু এসব খাতই নয় ধর্মের নামেও মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে একটি অশিক্ষিত, মতলববাজ চক্র প্রতারণার নেটওয়ার্ক বিস্তৃতই করেনি, করমুক্ত বাণিজ্যও চালিয়ে যাচ্ছে। সমাজের সব ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে প্রতারক, বিশ্বাসঘাতক শক্তির বিরুদ্ধেও মাদকবিরোধী অভিযানের মতো সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন