• রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮, ৪ ভাদ্র ১৪২৫
  • ||

অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ঘুমিয়ে থাকতে পারে না

প্রকাশ:  ০৬ জুন ২০১৮, ০০:০১
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট

টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও কাউন্সিলর একরাম হত্যাকাণ্ডের অডিও রেকর্ড যারা শুনেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা তাদের হৃদয়স্পর্শী ও আবেগমথিত অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, শুনতে গিয়ে চোখে পানি এসে গেছে। কেউ কেউ লিখেছেন, ভয়ে বুক ধড়ফড় করেছে। পুরো অডিও শুনতে পারেননি। অনেকে লিখেছেন, একরামের কন্যার আর্তনাদে তাদের কলজে পুড়েছে। নিজ কন্যার কথা মনে হয়েছে। অসহায়ত্ববোধ করেছেন।

বিএনপি শাসনামল থেকে এ যাবৎকালে ক্রসফায়ার থেকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে শীর্ষ সন্ত্রাসী, চরমপন্থী, মাদক ব্যবসায়ীসহ অনেকের নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ হয়ে আসলেও এ ধরনের লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের এমন অডিও কখনো প্রকাশ হয়নি। র‌্যাব সদর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, অডিও তারা খতিয়ে দেখবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালই নয়, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, এ ঘটনার তদন্ত হবে। কেউ দায়ী হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একরাম হত্যার অডিও টেপ ভাইরাল হয়েছে। ১৪ মিনিটের অডিও টেপটি যারাই শুনেছেন, শিউরে উঠেছেন। অনেকে বলেছেন, আজ যারা বদির শাস্তি চাইছেন, এমন অডিও রেকর্ড যদি তাঁকে নিয়েও হত, তাহলেও এরা কাঁদতেন। যে যাই বলুন, এই অডিও টেপ ফাঁস হওয়ায় অপারেশনের দুর্বলতাই ফুটে ওঠেনি, নৃশংশতার চিত্রপটও উঠে এসেছে। জনসমর্থিত একটি মাদকবিরোধী যুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এমনটি করা হয়েছে কি না? সেই প্রশ্নও উঠেছে। মানুষ বলছে, মাদকবিরোধী অভিযান চাই। তাই বলে, এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড নয়।

দফায় দফায় একরামের সঙ্গে সেই রাতে তাঁর মেয়েটির কথোপকথন হয়েছে। একরামের মোবাইলে প্রথম দফা তাঁর মেয়ে জানতে চেয়েছে, আব্বু কোথায়? একরাম বলছেন, আমি যে মিটিংয়ে গিয়েছিলাম, ...সাহেব ডেকেছিলেন যে, ওখান থেকে টিএনও অফিসে মিটিংয়ে যাচ্ছি। আমি চলে আসব (ইনশাল্লাহ)। ঠিক আছে ঘুমাও। টেলিফোন লাইন কেটে গেলে তৃতীয় দফা যখন ফোন করেন, তখন মেয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলতে গেলে ভীত সন্ত্রস্ত একরাম বলছেন, আমি নীলা যাচ্ছি। মেয়ে জানতে চেয়েছে, নীলা কেনো? একরাম বলছেন, জরুরি কাজ আছে। এ সময় উৎকণ্ঠিত মেয়ে বাবার জড়িয়ে যাওয়া গলা শুনে জানতে চায়, তুমি কাঁদছো কেনো? একরাম তখন আর কথা বলতে পারে না। টেলিফোন লাইন কেটে যায়। চতুর্থবার একরামের স্ত্রী আবার ফোন করেন। মোবাইলে রিং হতে থাকে। একরামের স্ত্রী ভয়ার্ত কণ্ঠে বলতে থাকেন, “আল্লাহ ফোনটা ধর, হ্যালো... কে কে? আমি কমিশনারের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি? ফোনটা কে ধরেছেন? আমি উনার মিসেস বলছি, হ্যালো... হ্যালো... এ সময় শোনা যায়, তুমি জড়িত কি না? তখন শার্টার টানা, গুলির শব্দ, গোঙানির আওয়াজে একরামের মেয়েরা কেঁদে ওঠে। একরামের স্ত্রী বিলাপ করতে থাকেন, আমার জামাই কিছু করে নাই। আমার জামাই নির্দোষ। ও আল্লাহ আল্লাহ... আপনারা কোথায়? এরমধ্যে পুলিশের হুঁইসেল শোনা যায়। আমার জামাই কিছু করে নাই শব্দগুলো ভেসে আসে। মেয়েও ফোন নিয়ে বলতে থাকে হ্যালো ...হ্যালো... ওই প্রান্তে হুঁইসেল আর গালির আওয়াজ। এ প্রান্তে কান্না আর আর্তনাদ। একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগমের মতে, সেদিন রাত ১১টা ৩২ মিনিটের পর তাঁর স্বামী একরামকে হত্যা করা হয়।

একরাম হত্যাকাণ্ডের পর গণমাধ্যমসহ নানা মহলে বলাবলি হতে থাকে, একরাম ইয়াবা ব্যাবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি ছিলেন মাদকবিরোধী অবস্থানে। একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য বদির বিরুদ্ধেও ছিল তাঁর অবস্থান। স্থানীয় থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী কোনো মামলাও নেই। নেই কোনো অভিযোগ। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় তাঁর নাম ছিল। শুধু তাই নয়, এর আগে প্রভাবশালী প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া একরামকে একজন মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে জাতির সামনে উন্মোচিত করেছিল।

এমপি বদিকে নিয়েও গণমাধ্যমসহ নানা মহলে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, অভিযোগ থাকলেও কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। তথ্য-প্রমাণ গণমাধ্যমের কাছেই কতটা বদির ইয়াবা সংশ্লিষ্টতার বা একরামের জড়িত থাকার ব্যাপারে রয়েছে, সেটিও এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

তবে দেশের মানুষ জানেন, টেকনাফ হলো ইয়াবা সাম্রাজ্যের রাজাধানীই নয়, নাফ নদীর তীরবর্তী এই শহর দিয়ে সারাদেশে ইয়াবার ব্যবসা ও নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছে এবং কক্সবাজার থেকে টেকনাফে অনেকেই ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কারা এই ইয়াবা ব্যবসার মাফিয়া? কারা বড় ডিলার? কারা খুচরা বিক্রেতা? মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ ভাল বলতে পারবেন।

দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যখন গোটা দেশের ব্যবসায়ী সমাজকে চাঁদাবাজির চাপে জিম্মি করে ত্রাসরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল, ঠিক তখন বিএনপি জামানায় কালো পোশাক পরিহিত বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে চৌকস ফোর্স হিসেবে র‌্যাব গঠন করেছিল। বিএনপির শাসনামলে শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও সশস্ত্র চরমপন্থী অনেকেই ক্রসফায়ারে নিহত হন। সেই সময় তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ নানা মহল বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিলেন। মানবাধিকার সংস্থা থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনও এ নিয়ে নিন্দার তীর ছুড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হয় তো এ রকম যে, বিরোধী দলে থাকলে সহজ জনপ্রিয়তার জন্য যে ভাষায় কথা বলা যায়, ক্ষমতায় এলে সেই ভাষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় কঠিন অবস্থান নিতে হয়।

ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ জামানায়ও র‌্যাবের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকে। র‌্যাব শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কবল থেকে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনকে মুক্ত করে যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছিল, তেমনি সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনেও অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। জনসমর্থন পেয়েছে। মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন ঘটনায় র‌্যাবের কর্মকাণ্ডকে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তেমনি বিভাগীয় তদন্ত করে অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে হয়েছে র‌্যাবকে। নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারসহ র‌্যাবের বিপথগামী কেউ কেউ দায়িত্ববোধ থেকে সরে গিয়ে কারো কারো ব্যক্তিগত ভাড়াটের ভূমিকা নিয়েছিলেন। এরমধ্যে নারাণয়গঞ্জের সেভেন মার্ডার ছিল ভয়ঙ্কর লোমহর্ষক, যা র‌্যাবের ইমেজকে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ ও অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিচারের মাধ্যমে নানা মেয়াদে সাজা নিশ্চিত করা হলে, মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

একদিন বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন ছিল, সন্ত্রাসীদের কাছে সমাজ, সরকার ও রাষ্ট্র অসহায়ত্ববোধ নিয়ে থাকবে কি না? যারা এদেরকে বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছিলেন, তাদের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে অনেকে বলেছিলেন, স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ায় নিয়ে এলে স্বাক্ষী-সাবুতের অভাব ও আইনের ফাঁক গলে তারা নিশ্চিন্তে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে এবং দ্বিগুন ক্ষমতা নিয়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মানুষ হত্যার মতো অপরাধ সংঘটিত করে থাকে।

র‌্যাবের অ্যাকশনে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ক্রসফায়ারে জীবন হারিয়েছে, না হয় দেশ ছেড়েছে। বিনিময়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের কবল থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ এমনকি বাংলা ভাইদের মতো উগ্র ধর্মান্ধ শক্তির দিন-দুপুরে যে আস্ফালন, ঔদ্ধত্য ও বর্বরতা দৃশ্যমান হয়েছিল, সেই অশুভ শক্তিকে প্রতিরোধ ও নির্মূলে সাহসী ভূমিকা ছিল র‌্যাবের। এই যুদ্ধেও কালো র‌্যাব জয়ী হয়েছিল। অপারেশনে জঙ্গিরা নিহতই হয়নি, তাদের হাতে আটক হয়ে বাংলা ভাইদের ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছে। সাম্প্রতিককালে গোটা দেশজুড়ে মরণ নেশা ইয়াবার আগ্রাসনে গোটা দেশের অভিভাবকরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠিতই নন, তাদের শান্তি, ঘুম ও সুখ নির্বাসনে গিয়েছে। কি ধনী, কি গরীব প্রায় সবার ঘরে ঘরে ইয়াবার প্রসার ঘটেছে। নগর থেকে শহর, শহর থেকে গ্রাম- তরুণ প্রজন্ম মরণ নেশা ইয়াবায় আসক্ত হয়েছে। ইয়াবা সেবনকারীদের হাতে স্নেহময়ী বাবা-মা খুনের ঘটনাও দেখতে হয়েছে দেশকে। যে পরিবারে কেউ ইয়াবাসক্ত হয়েছে, সেই পরিবারে অভিশাপ নেমে এসেছে। পরিবার, সমাজ থেকে গোটা রাষ্ট্রজুড়ে তরুণ প্রজন্মকে ইয়াবায় আসক্ত করে নীতিহীন পথে রাতারাতি অঢেল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে উঠেছেন একদল ইয়াবা ব্যবসায়ী। এই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, রাতারাতি টাকাওয়ালা হবার নেশায় আসক্তদের একদল বড় ধরনের ডিলার, আরেকদল খুচরা বিক্রেতা, আরেক পক্ষ বহনকারী, এই মিলে কক্সবাজার টেকনাফ থেকে শুরু হওয়া ইয়াবা ব্যবসার রমরমা অন্ধকার বাণিজ্য গোটা দেশজুড়ে নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করেছে।

দেশ ও জাতির সম্পদ তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় ব্যাপক গণসমর্থন নিয়ে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মাদকবিরোধী অভিযানের ১৯ দিনে নিহতের সংখ্যা ১২৯ ও আটকের সংখ্যা অনেক।

প্রধানমন্ত্রী যখন সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তার আগেই একরাম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী সেই সংবাদ সম্মেলনে পরিস্কার বলেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। এমনকি তিনি প্রশ্ন করেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে নিরপরাধ কেউ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে কি না? সেদিনের সংবাদ সম্মেলনেও দেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মালিক-সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক এবং রিপোর্টাররা উপস্থিত ছিলেন। প্রশ্ন যে কয়টা করার পেশাদার রিপোর্টাররাই করেছেন। চিরচেনা তোষামোদকারীরা তৈলাক্ত ভাষণে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও বিরক্ত করেছেন, দেশের মানুষকে হাসিয়েছেন। আর গণমাধ্যমের অবস্থানকে লজ্জাজনক স্থানে নামিয়েছেন। কেউ কেউ অসহায়ত্ব নিয়ে বোবা দর্শকের মতো বসেছিলেন। সেখানেও প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে কেউ বলেননি, একজন নিরপরাধ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন!

মাদকবিরোধী এই অভিযানকে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষণে রেখেছে। অন্যদিকে একরাম হত্যাকাণ্ডের যে টেপ রেকর্ড প্রকাশ হয়েছে, তারপর সমাজের প্রতিক্রিয়া দেখে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ১০ জন নাগরিক বিচার বহির্ভূত এসব হত্যাকা- নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় এমন মৃত্যু কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা যত দ্রুত সম্ভব বিচারবহির্ভূত প্রতিটি হত্যাকা-ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে সঠিক তথ্য প্রকাশের মধ্যে দিয়ে ভয়-ভীতি থেকে মানুষকে মুক্ত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছন। বিবৃতি দাতারা হলেন, জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, হাসান আজিজুল হক, রামেন্দু মজুমদার, আতাউর রহমান, মামুনুর রশীদ, নির্মলেন্দু গুন, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, মফিদুল হক, গোলাম কুদ্দুস ও হাসান আরিফ।

গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বে শাহবাগে প্রতিবাদসভা করতে গেলে পুলিশি বাধায় তা পণ্ড হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই মাদকবিরোধী অভিযান চলবে না কি চলবে না? মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় বা মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের যুদ্ধের সবাই প্রশাংসা করছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছেন। এক পক্ষ বলছেন, বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যাকাণ্ড নয়, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে। আরেক পক্ষ বলছেন, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশেই মাদক ব্যবসায়ীদের দমন করতে গিয়ে জড়িত অনেককে এনকাউন্টারে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে একরাম হত্যাকাণ্ডের অডিও টেপ প্রকাশের পর আবেগ প্রবণ জনগণের চাপ প্রবল হওয়ায় সরকারের স্নায়ু চাপ বেড়েছে। সরকারকেই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন পথ অবলম্বন করবে?

তবে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা যেমন রাষ্ট্রের রয়েছে, তেমনি মানব সম্পদ বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইয়াবার মতো মরণ নেশার ছোবল থেকে রক্ষার দায়ও রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। যেমনভাবে এড়াতে পারেনি, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদের বেপরোয়া উন্মাসিক আক্রমণকে। রাষ্ট্র কাউকে সংবিধান, আইন, বিধি-বিধানের ঊর্ধ্বে উঠতে দিতে পারে না। সংবিধান, আইন, বিধি-বিধান কার্যকর হলে রাষ্ট্রের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাই নয়, মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এমনকি ভেজালের মতো বিষাক্ত খাবার থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পারে। আজকের সামগ্রিক সংঘটিত অপরাধ ও অব্যবস্থাপনার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। যখন যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তারাও কেউ এই দায়িত্ব হেসে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। যখন যারা ক্ষমতায় তাদের কেন্দ্রীয় হোক আর স্থানীয় হোক ক্ষমতাবানদের ছায়ায় আজ্ঞাবহ প্রশাসনের সহায়তায় একদা সন্ত্রাসের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছিল। তাদের একই প্রক্রিয়ায় জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাবাদের উত্থান ঘটেছিল।

সেই পথ ধরে আজকের বাংলাদেশে মাদক ব্যবসায়ীদের উত্থান গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে বিষাক্তই নয়, অভিশপ্ত করে তুলেছে। বিষাক্ত খাদ্যেও ভেজাল নগর থেকে তৃণমূলে ছড়িয়েছে। মুনাফালোভী, সুযোগসন্ধানী, মূল্যবোধহীন অবক্ষয়ের এই সময়ে রাতারাতি সহজ পথে বিত্ত-বৈভব, ভোগ-বিলাসের কাঙ্গালিপনায় একটি শক্তিকে বিশাল পরিসর দিয়েছে। এরা গোটা দেশজুড়ে দুর্নীতি, খাদ্যে ভেজাল ও মাদকের আগ্রাসনের মুখে জাতিকে ঠেলে দিয়েছে। এই শক্তি জনগণের শত্রু। রাষ্ট্র তার ও জনগণের শত্রুকে ছাড় দিতে পারে না। একরাম হত্যাকা-ের অডিও টেপ ধরে জন্ম নেয়া বিতর্কের অবসানে সঠিক তদন্ত, কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সরকারের যেমন জরুরি, তেমনি মাদকের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ অব্যাহত রাখা সময়ের দাবি। অপরাধ প্রবণ শক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের হয়ে সরকারের সকল অপরাধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিততেই হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে সরকারের সামনে বিজয়ের বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। আর রাষ্ট্র তার সংবিধান এবং আইন বিধি-বিধানের চেয়ে কারো ক্ষমতাবান হওয়ার সুযোগ নেই।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি ডট নিউজ সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

মাদকবিরোধী অভিযান,পীর হাবিবুর রহমান