• রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫
  • ||

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইফতারী

‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’

প্রকাশ:  ১৭ মে ২০১৮, ১৫:৫৭ | আপডেট : ১৭ মে ২০১৮, ১৯:০২
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট
ফাইল ছবি

ঢাকার বয়স ৪০০ বছরের বেশি হলে ঢাকার ইফতারির ইতিহাসটাও চার শতাব্দীর। সেই আদিকালে ইফতার করাকে বলা হতো ‘রোজা খোলাই’। এখনো পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় রোজা খোলাই শব্দটির প্রচলন রয়েছে। রোজা খোলাই শব্দটি পাঠকের কাছে নতুন মনে হতে পারে, কিন্তু রমজান মাসে পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দারা এই শব্দটির ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল বা বলা যায় কিছু কিছু এলাকায় এখনো আছে। রোজা খোলাই অর্থ ইফতার করা।

ভোজন বিলাসে রশিক বাঙ্গালী, এটা বাঙ্গালীর সত্তার সাথে মিশে আছে। আর ইফতারে নানা রকমের উপাদেয় খাদ্যসামগ্রী থাকতেই হবে এটা যেন একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা বাঙ্গালীর কালচারও বলা চলে। সেই কালচারের প্রবাহমান ধারায় হচ্ছে পুরান ঢাকার চকের ইফতার বাজার।

রমযানের ইফতার আয়োজনে ঘরে তৈরি খাবারের পাশাপাশি বাইরের নানা পদের ইফতারির কদরও বেড়ে যায়। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইফতারি কিনতে অনেকেই ভিড় জমান পুরান ঢাকার চকবাজারে। তাই প্রথম রোজায় দুপুর থেকেই বিক্রেতাদের হাঁক-ডাক আর ক্রেতাদের উপস্থিতিতে সরগরম চকবাজারের ইফতার বাজার।

ইফতার বাজার হিসেবে পুরান ঢাকার চকবাজারের ইতিহাস ও ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। খানদানি ইফতারি মানেই পুরান ঢাকার ইফতার সামগ্রী। রমজানের প্রতিদিন দুপুর থেকেই চকবাজার ছাপিয়ে পুরান ঢাকার অলিগলির বাতাসে ভাসে নানা স্বাদের মুখরোচক খাবারের মনকাড়া সুবাস। ঐতিহ্য বজায় রেখে দোকানি আর ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর রমজানে আনছেন নতুন নতুন ইফতার আয়োজন। মূল আয়োজনটা চকবাজারকে ঘিরেই। এই বাজারের ইফতার সামগ্রীর প্রতি সব সময়ই বিশেষ আগ্রহ থাকে রোজাদারদের।

রোজার প্রথম দিন ইফতার আয়োজনে সব রোজাদার সাধ্যমতো বিশেষ কিছু যোগ করতে চান। অনেকেই ভিড় করেন চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী এসব ইফতারির দোকানে। ইফতার সামগ্রীর বৈচিত্র্যই নগরীর এ প্রান্ত ও প্রান্ত থেকে লোকজনকে টেনে আনছে এখানে। রকমারি সব ইফতারির নামও বাহারি।

নানা স্বাদের বাহারি ইফতারির দিকে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বিক্রেতারা মরিয়া।

ক্রেতারা খোলা টেবিলে ইফতার সামগ্রীর পসরা থেকে বেছে নিচ্ছেন পছন্দেরটি। খোলা খাবার তাই স্বাদ ও মান নিয়ে মিশ্র অভিযোগ ক্রেতাদের। দামও কিছুটা বেশি বলেই মনে করেন তারা। আর স্বাদে ভিন্নতা আনতে প্রতি বছরের মত এবারও দু'একটি নতুন পদ যুক্ত হয়েছে ইফতার আয়োজনে। বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও এসেছে তার পছন্দের ইফতারি বেছে নিতে।

ইফতারের ইতিহাস খানদানি ইফতারি মানেই পুরান ঢাকার ইফতার সামগ্রী। মোগল আমলের ঐতিহ্যের ছাপ ও ছোঁয়ার এসব ইফতারি কালক্রমে ঢাকার সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়লেও এখনো স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান পুরান ঢাকাতেই। প্রতি বছরের মতো এবারও সরগরম হয়ে উঠছে ঢাকার চকবাজার, নাজিমউদ্দিন রোড, চক সার্কুলার রোড, নর্থ সাউথ রোড, শাহী মসজিদ রোডসহ বিভিন্ন এলাকা। শত শত দোকানে রকমারি ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানি। একেক দোকানে একেক ধরনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ইফতারি। এই রকমারি ইফতার বাজারের একটি জনপ্রিয় আইটেম 'বড় বাপের পোলায় খায়'।

রমজান মাসে চকবাজারে ইফতার কিনতে গেলে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায় তা হচ্ছে, ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়।’ রকমারি ইফতার বাজারের একটি জনপ্রিয় আইটেম ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। জানা যায়, ঐতিহ্যবাহী এই পদটি প্রায় ৭৫ বছরের পুরনো। বড় বাপের পোলায় খায়

এটি তৈরিতে ডিম, গরুর মগজ, আলু, ঘি, কাঁচা ও শুকনো মরিচ, গরুর কলিজা, মুরগির মাংসের কুচি, মুরগির গিলা কলিজা, সুতি কাবাব, মাংসের কিমা, চিড়া, ডাবলি, বুটের ডাল, মিষ্টি কুমড়াসহ ১৫ পদের খাবার আইটেম ও ১৬ ধরনের মসলা প্রয়োজন। আর মোট ৩১টি পদের যে মিশ্রণ তৈরি হয়, তার নামই ‘বড় বাপের পোলায় খায়’।

একটি বড় গামলায় এই ৩১ ধরনের পদ দুই হাতে ভালোভাবে মাখিয়ে তারপর ঠোঙায় করে বিক্রি করা হয়। এটি কিনতে ছোট-বড় সব বয়সী রোজাদারের মধ্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি লেগে যায়।

কেবল এই আইটেমটির জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা ছুটে যান চকবাজারে। এখনো পুরান ঢাকার এমন অনেক পরিবার আছে, যাদের এটি ছাড়া ইফতার জমে না, পূর্ণতা পায় না। নতুন ঢাকার বাসিন্দারাও দিন দিন এই খাবারটির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বর্তমানে মূল্য প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত।

খাদ্যের রসনা বিলাস বাঙ্গালীর শত শত বছরের পুরাতন ইতিহাস। সেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখে এখনো পুরান ঢাকার বুকে চলছে শত বছরের বাহারী রকমের ইফতার। সেই সব মুখরোচক ইফতার হোক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং সবার জন্য দামের দিক দিকে অনুকুল। এক মাস রমজান সবাই সুস্থতার সাথে পাল করুক।

শিকের ভারী কাবাব চকবাজার ছাড়া আর কোথাও পাবেন না। এক কেজি কাবাবের দাম ৮০০ টাকা। দইবড়া ছয় পিসের বক্স ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, পনির কেজিপ্রতি মূল্য ১৮০ টাকা, চিকেনকাঠি প্রতিটির দাম ৩০ থেকে ১০০ টাকা, কোয়েল পাখির রোস্ট প্রতিটি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, খাসির রান ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, আস্ত মুরগির রোস্ট ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, কবুতরের রোস্ট ১১০ থেকে ১৬০ টাকা, কোফ্তা প্রতিটি ২০ টাকা, পুরি প্রতিটি ৩ থেকে ১০ টাকা আর চকের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার বড়বাপের পোলারা খায় ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়-এর কেজিপ্রতি দাম হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।

চকবাজারের ইফতারিপাড়ায় রমজানের প্রথম দিন পা দিয়ে দেখা গেল এসব মুখরোচক খাবারের হাঁকডাক আর ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। এর মধ্যে চারদিকে ‘বড় বাপের পোলারা খায়, ধনি-গরিব সবাই খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়’-এর হাঁকডাকে চিরচেনা চকবাজারের চেহারা দুপুরের পর থেকেই পাল্টাতে থাকে। তা ছাড়া পুরান ঢাকার বংশালের আল রাজ্জাক রেস্টুরেন্ট, আল-নাসের, রায়সাহেব বাজারের ক্যাফে ইউসুফ, আল-ইসলাস, মতিঝিল ঘরোয়া স্টার তাদের মানসম্মত খাবারের সম্ভার সাজিয়েছে ইফতারের প্রথম দিন থেকেই। ছবিতে দেখে নিন চকবাজার, নাজিরাবাজার, বংশাল, রায়সাহেব বাজারের ইফতারি মেলার এক ঝলক।