• মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ৮ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

দেশভ্রমণে শতক ছোঁয়ার পথে নাজমুন

প্রকাশ:  ২০ এপ্রিল ২০১৮, ১৭:৩৬ | আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৮, ১৭:৪৯
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরের মেয়ে নাজমুন নাহার। থাকেন সুইডেনে। ভ্রমণের অদম্য নেশায় ছুটে চলেছেন দেশ-দেশান্তরে। গত ১৭ বছর বলতে গেলে একা একাই চষে বেড়াচ্ছেন সারা পৃথিবী। দেশ-দেশান্তর ভ্রমণের অদম্য নেশায় ইতিমধ্যে তিনি ঘুরেছেন ৯৩টি দেশ। ভেসেছেন সমুদ্রে, উঠেছেন বহু সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গে। ঝুঁকি থাকার পরও গিয়েছেন ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাজ্যের কয়েকটি ঔপনিবেশিক দ্বীপপুঞ্জে। এ মাসেই দেশভ্রমণে সেঞ্চুরি করবেন তিনি- দুই চোখ ভরে উঠবে একশ'টি দেশ দেখার আলোয়।

বৃহস্পতিবার কাতারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন নাজমুন নাহার। কাতার থেকে তিনি তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তানসহ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করে ইউরোপ হয়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে যাবেন। এর পর দেশে ফিরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভুটান ভ্রমণের মধ্য দিয়ে তিনি শততম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক গড়বেন।

বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী নারী পরিব্রাজক হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছেন নাজমুন নাহার । বাংলাদেশের কথা বিশ্ববাসীকে জানাতেই তার এই স্বপ্নযাত্রার শুরু। 'যে পথে তুমি একা সেই পথে তুমি পাবে বহু পথিকের দেখা'- এ দর্শনকে সঙ্গী করে ঘর থেকে বাইরে পা ফেলে একের পর এক দেশ ভ্রমণ করে চলেছেন তিনি। অবিবাহিত হওয়ায় একা একাই ছুটেছেন দেশ থেকে দেশে। অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর অদম্য মনোবল নিয়ে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি দেখার অনাবিল নেশা তাকে তাকে অনুপ্রাণিত করেছে পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ২০০০ সালে প্রথম ভারতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে নাজমুন নাহার শুরু করেছিলেন তার পরিভ্রমণ। শেষ ভ্রমণ করেছেন গত বছর নিউজিল্যান্ডে। তার ভ্রমণের ঝুলিতে নিউজিল্যান্ড ৯৩তম দেশ। এর পর ভ্রমণে বিরতি দিয়ে গত ডিসেম্বরে তিন মাসের জন্য দেশে আসেন। ঘুরে বেড়ান সারাদেশ। তরুণ-তরুণী ও শিশুদের ভ্রমণে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, অনাথ আশ্রমের বাসিন্দা, এমনকি পথশিশুদেরও শুনিয়েছেন তিনি তার বিশ্বভ্রমণের গল্প।

নাজমুন নাহার ১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার গঙ্গাপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ব্যবসায়ী বাবা মোহাম্মদ আমিন ২০১০ সালে পৃথিবী ছেড়ে গেছেন। মা তাহেরা আমিন। ৩ ভাই এবং ৫ বোনের মধ্যে নাজমুন নাহার সবার ছোট। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ঢাকায় চলে আসেন। কিছুদিন সাংবাদিকতা করেন এক বিনোদন সাময়িকীতে। ২০০৬ সালে শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে চলে যান সুইডেন। সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন। পড়াশোনার ফাঁকে খণ্ডকালীন কাজও করতেন তখন। কয়েক মাসের জমানো টাকায় জাহাজে ভ্রমণ করেন ফিনল্যান্ড। সেই থেকে শুরু হয় তার একের পর এক দেশভ্রমণ।

চিলির আতাকামা, আর্জেন্টিনার মেন্দোজা সিটি, উরুগুয়ের পুন্টা ডেল এস্তা, ব্রাজিলের ফোজ দু ইগুয়াজু, জ্যামাইকার ট্রেন্স টাউন, ডোমিনিকান রিপাবলিকের সাওনা আইল্যান্ড, মেক্সিকোর কানকুন, আইসল্যান্ডের ল্যান্ডমান্নালুগার, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, পানামা সিটি, নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট কুক, গ্রিসের সান্তোরিনি আইল্যান্ড, মন্টিনিগ্রোর কট্টর, বসনিয়ার বিষ্যেগ্রাদ শহর, সুইজারল্যান্ডের উন লাউটারবার্ন ভিলেজসহ উল্লেখযোগ্য অনেক স্থানেই পরিভ্রমণ করেছেন তিনি। কখনো একা, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে, কখনো কোনো সম্মেলনে অংশ নিতে চলে যান নতুন নতুন দেশে। তবে যেখানেই যান, লাল-সবুজের ছোট্ট একটা পতাকা সঙ্গেই থাকে। নতুন কোনো মানুষের সঙ্গে পরিচয়ে নির্দ্বিধায় বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।’

ছোটবেলায় বাবার কাছে নানা ভ্রমণকাহিনী শুনেই নাজমুন নাহারের মনে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন দানা বাঁধে। তা ছাড়া তার দাদা আলহাজ ফকীহ মৌলভী আহাম্মদ উল্লাহও ছিলেন ভ্রমণপিপাসু মানুষ। কখনও ঘোড়ায়, কখনও জাহাজে- এভাবে আরবের অনেক দেশই ভ্রমণ করেছেন তিনি। দু'জনের ভ্রমণপ্রীতি ঠাঁই পায় তার অবচেতনে। আর তাতে গতি আনে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর বই পড়ার নেশা। দেশ-বিদেশের ভ্রমণকাহিনী আকর্ষণ করতে থাকে তাকে। বইয়ের পাতা থেকে বিভিন্ন দেশ নাজমুনকে হাতছানি দিয়ে ডাকে বিশ্বজয়ের পথে এগিয়ে যেতে।

ছুটিতে বাংলাদেশে অবস্থানকালীন সময়ে গণমাধ্যমকে নাজমুন নাহার বলেন, নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে এগিয়ে যাবে, অনেক মানুষ অর্থ উপার্জন করে গাড়ি বাড়ি, দামি জিনিসপত্র ক্রয় করেন। কিন্তু আমি তা না করেই উপার্জিত অর্থ দিয়ে বিশ্ব ঘুরেছি। ভ্রমণকালে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছি। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরা ইচ্ছা করলেই অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে আমি সেটাই প্রমাণ করেছি। পৃথিবীটা আমার অনেক পছন্দের। এটা যখন আমি দেখি তখন মনে হয় এখনো তো পৃথিবীর কিছুই দেখিনি। আমি এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৯৩টি দেশের অসংখ্য স্থান চষে বেড়িয়েছি। বেশিরভাগ দেশই আমি ঘুরে বেড়িয়েছি একা একা। আমার ইচ্ছা পুরো পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোর। পৃথিবীকে কাছ থেকে জানার জন্যই আমি জন্ম নিয়েছি। ব্যক্তিগত কোন উদ্দেশ্য নেই আমার। তিনি আরো বলেন, ভ্রমণ করেছি তা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। মন থেকে খারাপ চিন্তা সরাতে হবে। দেশ ও মানুষের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। ৯৩টি রাষ্ট্রে ভ্রমণকালে ৩বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি তবুও হাল ছাড়েনি। যদি ভ্রমণে মৃত্যু হতো তা গ্রহণ করতাম। একা একা ভ্রমণে বের হই বলে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন, আসলে একা ভ্রমণ করলে আপনি শিখবেন কীভাবে সব পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়; কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশকেও জয় করা আর জীবনের স্বাধীনতাকে উদ্‌যাপন করা যায়।

ভ্রমণে নানা প্রাকৃতিক ও পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে এগোত হয়েছে নাজমুনকে। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন বহুবার। তবুও তিনি বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখেন।