• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫
  • ||

আমাদের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ

প্রকাশ:  ২৫ মার্চ ২০১৮, ১৭:১২
রুদ্র মাহমুদ
প্রিন্ট

প্রতিটি মানুষই অবাধ স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে চায়। উপভোগ করতে চায় পাখির ডানায় আকাশের সীমাহীন নীলিমায় উড়ে যাবার। স্বাধীনতা, এই শব্দটির সঙ্গে মানুষ তার নিবিড় একাত্মতা অনুভব করে। কারণমানুষ মাত্রই আকাঙ্ক্ষা থাকে স্বাধীনতার। প্রতিটি মানুষই অবাধ স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে চায়। উপভোগ করতে চায় পাখির ডানায় আকাশের সীমাহীন নীলিমায় উড়ে যাবার। স্বাধীনতা, এই শব্দটির সঙ্গে মানুষ তার নিবিড় একাত্মতা অনুভব করে। কারণ প্রতিটি মানুষ মাত্রই আকাঙ্ক্ষা থাকে স্বাধীনতার। আর এ স্বাধীনতা যদি হয় রক্তের বিনিময়ে, অনেক সংগ্রামের বিনিময়ে তাহলে তার স্বাদটাও পাল্টে যায়। তখন এই স্বাধীনতা হয়ে ওঠে আরও বেশি অর্থবহ।

আমাদের সাহিত্যে বাঙালির মুক্তির স্বপ্ন রূপায়িত হয় ১৯৪৭ পরবর্তী সাহিত্যের ভেতর। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১, এ সময়কাল বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সবচেয়ে ঘটনাবহুল কাল। ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে মুক্তির যে চেতনা এ অঞ্চলের মানুষের মন ও মননে প্রোথিত হয় একাত্তরের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তা চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। বাঙালি অর্জন করে তার কাঙ্খিত স্বাধীনতা।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যাপক আকারে উদ্ভাসিত। গল্প কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যসহ এমন কোনো শাখা নেই যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কমবেশি প্রতিফলিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য অনিবার্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং হচ্ছে বাংলাদেশের লেখকদের কাছে। কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ দিনের অর্থাৎ পাকিস্তানিদের শোষণ, নির্যাতন, অত্যাচার উৎপীড়ন ছবির মতো ফুঠে উঠেছে। একই সঙ্গে বীর বাঙালির প্রতিবাদ প্রতিরোধের চিত্রও অঙ্কিত হয়েছে অসাধারণ মুন্সীয়ানায়।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যাপক আকারে উদ্ভাসিত। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যসহ এমন কোনো শাখা নেই যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কমবেশি প্রতিফলিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য অনিবার্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং হচ্ছে বাংলাদেশের লেখকদের কাছে। কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ দিনের স্মৃতি অর্থাৎ পাকিস্তানিদের শোষণ, নির্যাতন, অত্যাচার উৎপীড়ন ছবির মতো ফুটে উঠেছে।

পাকিস্তানের শাসনকালে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ বছর (১৯৪৭-১৯৭১) অনেকগুলো বাংলা গ্রন্থ রচিত মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। এ সময়ে প্রায় ৬০টি কাব্য, ১৩৩০টি উপন্যাস, ৫৮০টি নাটক, ৩৪০টি ছোটগল্প সংগ্রহ, ২৭০টি প্রবন্ধ গ্রন্থ এবং ৩৫০টি ধর্মালোচনা-সংক্রান্ত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ১৯৭১ সালের পরই কেবল বাংলাদেশের সাহিত্য স্পষ্টভাবে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পেতে শুরু করে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের লেখকেরা কথাসাহিত্যে সোনার ফসল ফলিয়েছেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ অনেকগুলো উপন্যাসে রক্তের অক্ষরে লেখা রয়েছে। আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯); শওকত ওসমানের জাহান্নাম হতে বিদায় (১৯৭১), দুই সৈনিক (১৯৭৩), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), রাজা উপখ্যান; আনোয়ার পাশার রাইফেল, রোটি, আওরাত (১৯৭৩) সরাসরি স্বাধীনতাসংগ্রামের পটভূমিকায় রচিত। সংগ্রামের মর্মান্তিক বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চিত্র এসব উপন্যাসে অঙ্কিত হয়েছে। এ ছাড়া সরদার জয়েন উদ্দীনের বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ (১৯৭৫); শওকত আলীর যাত্রা (১৯৭৬), উত্তর খেপ (১৯৯১); হুমায়ূন আহমদের শ্যামল ছায়া (১৯৭৪), নির্বাসন (১৯৭৪), সৌরভ (১৯৮২), ১৯৭১ (১৯৮৬), আগুনের পরশমণি (১৯৮৬); অহমদ ছফার ওঙ্কার (১৯৭৫), অলাতচক্র (১৯৯০); রশীদ হায়দারের খাঁচায় (১৯৭৫) বিশেষ মনোযোগ পেয়েছে পাঠক মহলে।

সেলিনা হোসেনও একটি রক্তাক্ত সংগ্রামের গৌরব ও গ্লানির পরিচয় মেলে ধরেছেন তাঁর একাধিক উপন্যাসে। সেলিনা হোসেনের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপন্যাস হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬), নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি (১৯৮৭), কাঁটাতারে প্রজাপতি (১৯৮৯); সৈয়দ শামসুল হকের নীল দংশন (১৯৮১), নিষিদ্ধ লোবান (১৯৯০); আবু জাফর শামসুদ্দীনের দেয়াল (১৯৮৬); আমজাদ হোসেনের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র (১৯৯০); খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের কত ছবি কত গান বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে বিশেষ সমৃদ্ধ করেছে।

শুধু উপন্যাসেই নয়, কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ এসেছে নানাভাবে। বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবচেয়ে বেশি স্পন্দিত করেছে কবিতাশিল্পকে। অস্ত্র আসলে লড়াই করে না, লড়াই করে মূলত মানুষই। আর লড়াকু মানুষকে সবচেয়ে বেশি উজ্জীবিত করে কবিতা এবং গান। সুতরাং আমাদের মানতেই হবে যুদ্ধ জয়ের জন্য যেমন বন্দুক চাই, তেমনি কবিতাও চাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও সুকান্তের কবিতা সীমাহীন প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছে এ কথা বলাবাহুল্য। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধকালীন ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর কবিতা রচিত হয়েছে পর্যাপ্ত এবং বর্তমানেও হচ্ছে। এসব কবিতায় যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা উঠে আসছে এবং উঠে আসছে বাঙালির বীরত্ব ও আত্মোৎসর্গের গৌরবগাথা।

নাটকেও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের পর মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বহু নাটক রচিত হয়েছে বাংলাদেশে। সৈয়দ শামসুল হকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকটি মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত। আসকার ইবনে শাইখের তিতুমীর নাটকের নাট্যবস্তু স্বাধীনতাসংগ্রামের গৌরবময় অধ্যায় থেকে আহরিত হয়েছে। তাঁর অগ্নিগিরি প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে। এ নাটকের কাহিনি আমাদের মুক্তিসংগ্রামের এক অধ্যায়। মুনীর চৌধুরীর কবর ভাষা আন্দোলনের সময়কার ষড়যন্ত্র ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে নাট্যকারের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ হলেও মুক্তিসংগ্রামের প্রেরণা ছিল তাতেও।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক অবলম্বনে রচিত হয়েছে প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথা জাতীয় গ্রন্থ। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : এম আর আখতার মুকুলের আমি বিজয় দেখেছি; শামসুল হুদা চৌধুরীর একাত্তরের রণাঙ্গন; এম এস এ ভূঁইয়ার মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস; মেজর রফিকুল ইসলামের একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে; কাজী জাকির হাসানের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি; রফিকুল ইসলামের (বীর উত্তম) লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে; আসাদ চৌধুরীর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ; ছদরুদ্দীনের মুক্তিযুদ্ধ : বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে; আতিয়ার রহমানের মুক্তিযুদ্ধের অপ্রকাশিত কথা; মনজুর আহমদের একাত্তর কথা বলে; হেদায়েত হোসাইন মোরশেদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ঢাকায় গেরিলা অপারেশন।

মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত মননশীল ও গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করেছেন অনেকে। বদরুদ্দীন উমর রচনা করেছেন যুদ্ধপূর্ব বাংলাদেশ, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ। ড. রফিকুল ইসলাম রচনা করেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দেলন ও মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য, বাংলাদেশের সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ।

ব্যক্তিগত স্মৃতিকথার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও বহুল প্রচারিত একটি হচ্ছে জাহানারা ইমামের জার্নাল আকারে প্রকাশিত একাত্তরের দিনগুলি (১৯৮৬)। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে রশিদ হায়দার সম্পাদিত তেরো খণ্ডের স্মৃতি ১৯৭১-যা এক বিশাল সংগ্রহ। এ খণ্ডগুলোয় ১৯৭১ সালের সংঘাতে অংশগ্রহণকারী বা প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বর্ণনা সংক্ষিপ্ত আকারে সাজানো হয়েছে।