• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

মুদ্রানীতি আর রাজনীতির পেনিকে সর্বনাশ পুজিবাজার?

প্রকাশ:  ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২০:৫৭ | আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২২:১৩
খুজিস্তা নূর-ই-নাহারিন (মুন্নি)
প্রিন্ট

মুদ্রানীতি আর রাজনীতির পেনিকে ধরাশায়ী বর্তমানের পুজিবাজার ! যে ২০১৮ সাল পুজিবাজার সংশ্লিষ্ট সবার কাছে প্রত্যাশার বাজার হওয়ার কথা ছিল সমূহ বিপর্যয়ের কবলে সেই বাজারে আজ কেবলই হতাশা কেবলই ক্রন্দন, কেবলই দীর্ঘশ্বাস । সবার মুখে মুখে একটাই কথা, একটাই ভয় মুদ্রা বাজারকে রক্ষা করতে যেয়ে না পুজিবাজার ধ্বংস হয়ে যায় ! ৯৬ সালের পর ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অদূরদর্শিতায় বাজারে ৬ মাসের ভিতর ঋণ সীমা কমানোর আল্টিমেটাম থেকে সেই যে পতন শুরু, ২০১৩ তে এসে পুনর্বার আর এবারের সংকোচন মূলক মুদ্রানীতিতে আবারও এতো বড় ধাক্কা, যা সহজে সামলানো মুশকিল হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতির দুটি ধারা, মুদ্রা বাজার এবং পুজি বাজার। সরাসরি না হলেও একটি অপরটির সাথে সম্পর্কিত । যমজ শিশুর মত একটিতে আঘাত লাগলে অপরটিতেও তাঁর প্রভাব পরে। অর্থনীতি দেশের মেরুদণ্ড কিন্তু পুজিবাজার ধ্বস এলে দেশের শিল্প- বাণিজ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন সবকিছু বাঁধা গ্রস্থ হয়ে চরম বেকার সমস্যার সৃষ্টি হবে।

৯৬ সালে ধ্বসের ভিতর দিয়ে পুরো দেশের মানুষের সাথে পুজিবাজারের পরিচয় ঘটেছে, ২০১০ সালে পুনর্বার ধ্বস সাধারণ মানুষের মনে এক প্রকারের আতংকগ্রস্থতা এনে দিয়েছে। সেই থেকে সবাই কারণে অকারণে গৎবাঁধা পুঁজি বাজারকে দোষারোপ করে আসছেন। কিন্তু এইবার সমস্যাটা অন্যখানে, অন্য কোথাও। প্রচণ্ড তারল্য সংকটে নুয়ে পড়েছে গোটা ব্যাংকিং খাত। প্রতিনিয়ত ফোন ডিপোজিট চাই, প্রয়োজনে ডাবল ডিজিটের মুনাফা দিতে প্রস্তুত । এখন প্রশ্ন হল গত জুলাই মাসেও ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পাহাড় ছিল, গত ৬ মাসে কি এমন ঘটলো যে তারল্য সংকট প্রকট হলো ! কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, নিশ্চিত ও উন্নত জীবন-যাপনের লক্ষ্যে সেকেন্ড হোম প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর মানি লনডারিং এর মাধ্যমে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই সহ অন্যান্য দেশে পাচার হচ্ছে। এই লক্ষ্যে অনেকে ভুয়া এলসির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে দায় এড়ানোর লক্ষ্যে বিদেশে প্রাচার করে দিয়েছেন।

নিজেদের মধ্যে যোগসাজসে এক ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে নামে বেনামে লোন নিয়ে সম্পূর্ণ অনৈতিক ভাবে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন আর ব্যাংক গুলোতে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। আলিবাবার চিচিং ফাঁকের মত এইসব ফাঁক ফোকর এতদিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে এসেছে । অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী সমাজে দানবীর এবং ধর্মভীরু হিসেবে পরিচিত অনেকে সবার চোখে ফাঁকি দিয়ে ব্যাংকের দায়িত্ব প্রাপ্ত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজসে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে নিজেদের শক্তিশালী করেছে। কানাডার বেগম পাড়ায় ঘুরলে এই তথ্যের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। কেবল ব্যাংকের মালিক কিংবা ব্যবসায়ীরা নন, নাম করা রাজনীতিবিদ সহ অনেক অসাধু চাকরিজীবীদের স্ত্রীরাও বেগম পাড়া সহ অন্য সব দেশে অভিজাত এলাকায় বহাল তবিয়তে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেন।

অতএব মুদ্রাস্ফীতি সামাল দিতে ডলারের মূল্য ঠিক রাখার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়িত হয়েছে। আগে বিদেশ থেকে সহজ শর্তে ঋণ এনে দেশে বিনিয়োগ হতো কিন্তু বর্তমানে ডলারের মূল্য বৃদ্ধির আশংকায় ব্যবসায়ীরা তাঁদের ঋণ পরিশোধ করে দেশ থেকে ঋণ নেওয়াটাই লাভজনক মনে করছেন বিধায় হঠাৎ প্রচণ্ড তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে । উপরন্তু মুনাফা কমিয়ে দেওয়ায় ব্যাংক গুলোতে ডিপোসিট বা আমানতের হার কমে গেছে।

গত জুলাই মাস থেকে একের পর এক ব্যাংকের অধিগ্রহণ বা মালিকানা পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে খানিকটা অস্থিরতা এবং নৈরাজ্যেরও সৃষ্টি হয়। ঋণের বেশীরভাগ অংশ মাত্র কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়ায় অনেক অর্থনীতিবিদ সমগ্র মুদ্রাবাজার তথা দেশের সার্বিক আর্থিক খাতে এক ধরণের অস্থিতিশীলতার আশংকা প্রকাশ করেন। এমতবস্থায় মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা সংকোচন নীতি কেবল মুদ্রা নয় পুঁজি বাজারকেও সংকোচিত করে অশনি সংকেত ঘটানোর উপক্রম করেছে।

পুজিবাজার এমনিতেই প্রচণ্ড সংবেদনশীল একটি বাজার। ২০১০ সনে পুঁজি বাজার ধ্বসের ৭ বছর পর ২০১৭ তে এসে বাজারটা খানিকটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করার মুহূর্তে ঘোষিত সংকোচন মূলক মুদ্রানীতির কারণে আবারও অনিশ্চয়তায় অস্থিতিশীলতার আশংকা দেখা দিয়েছে। ২০১৮ সাল নির্বাচনী বছর হওয়ার কারণে, অতীত অভিজ্ঞতায় রাজনৈতিক আবহাওয়া বৈরী হওয়ার আশংকায় অনেক বিনিয়োগকারীই শেয়ার সেল করে হাত গুঁটিয়ে বসে আছেন সঠিক সময়ের অপেক্ষায়।

২০১০ এ ধ্বসের পর ব্রাঞ্চ বন্ধ করে এমনিতেই সংকোচন নীতি গ্রহণ করা হয়। তারপর থেকে একের পর এক নিয়ম-নীতির গণ্ডীতে পুঁজি বাজার যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে বার বার পলিসি বদল , রুলস এন্ড রেগুলেসনের পরিবর্তনের সাথে আবার সঙ্কুচিতও হয়েছে।

যেমন এখনো পর্যন্ত এক্সপোজারের সংজ্ঞা অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। লিস্টেড বিভিন্ন কোম্পানির ক্ষেত্রে অডিটেড রিপোর্ট এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে কর্পোরেট গভারনেন্স বা সুশাসনের অভাব প্রায়শই পরিলক্ষিত হয়। সংযোজিত হয়েছে নতুন সমস্যা তথ্য ফাঁস যা লেন-দেনে ভোগান্তির সৃষ্টি করে এক ধরণের বিভ্রাট ঘটাচ্ছে । এই সকল চিহ্নিত সমস্যা সমাধান না হলে পুঁজি বাজার স্থিতিশীল হওয়া সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ডামাডোলে স্বার্থান্বেষী মহল ফয়দা লুটতে চাইবে স্বাভাবিক, বাজারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা, অপতৎপরতা থাকবে আর ষড়যন্ত্র ডালপালা মেলবেই কিন্তু তাঁদের এই অসুস্থ প্রয়াসকে মূলেই উৎপাটন না করতে পারলে সমূহ বিপদ অপেক্ষা করছে পুরো দেশের জন্য ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একজন মহীয়সী নারী, সাহিত্যের ছাত্রী হয়েও যিনি একাধারে সমাজ, রাষ্ট্র, বিজ্ঞান, সবকিছু সফলভাবে সামলানোর পাশাপাশি বারংবারই পুরো অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। একক প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এখন সময় এসেছে দেশের প্রতিথযশা অর্থনীতিবিদদের সাথে নিয়ে অর্থনৈতিক খাতের পুনর্বিন্যাস করার। কারণ ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে দেশের ক্রান্তিকালে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর একক সিদ্ধান্ত তাঁর দৃঢ়তা দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সময় প্রমাণ করেছে প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনিই সঠিক ছিলেন।

দেশের অর্থের গোলায় ইঁদুর ঢুকেছে সময়মত এই ইঁদুরকে নিধন করতে না পারলে মহীরুহের মত সমস্ত দেশটিকে গ্রাস করবে একদিন । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সতর্ক হোন, অন্যান্য ক্ষেত্রের মত অর্থনৈতিক সেক্টরেও আপনার দৃঢ় এবং সুচিন্তিত হস্তক্ষেপ জরুরী ।

/এসএইচ

apps