• শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮, ৩ ভাদ্র ১৪২৫
  • ||

আবারো ব্যাংকিংখাতে হরিলুট

প্রকাশ:  ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৬:২০
অর্থনৈতিক ডেস্ক
প্রিন্ট

আবারো ব্যাংক লুটের খবর এসেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে এমন ভয়ংকর ব্যাংক লুটের খবর। অর্থব্যবস্থাকে দুর্বল করতে বারবার এমন ঘটনা ঘটার পরও টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্টদের। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ভয়ংকর রকম উদারভাবে ঋণ বিতরণ করেছে জনতা ব্যাংক। এক গ্রাহককেই মাত্র ৬ বছরে তারা দিয়েছে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার ঋণ ও ঋণসুবিধা। নিয়মনীতি না মেনে এভাবে ঋণ দেওয়ায় বিপদে ব্যাংক, গ্রাহকও ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না।

জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে। অর্থাৎ এক গ্রাহক ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পেতে পারেন না। দেওয়া হয়েছে মোট মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ।

ব্যাংক দেখভাল করার দায়িত্ব যাদের, সরকারের নিয়োগ দেওয়া সেই পরিচালনা পর্ষদই এই বিপজ্জনক কাজটি করেছে। হল-মার্ক ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর এটিকেই পারস্পরিক যোগসাজশে সাধারণ মানুষের আমানত নিয়ে ভয়ংকর কারসাজির আরেকটি বড় উদাহরণ বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তারা বলছেন, এটি একক ঋণের বৃহত্তম কেলেঙ্কারি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাতের সময় এই অর্থ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এ সময় ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলরাম পোদ্দার, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক নাগিবুল ইসলাম ওরফে দীপু, টাঙ্গাইলের কালিহাতী আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী যুবলীগ নেতা আবু নাসের প্রমুখ।

অনুসন্ধানেও জানা যাচ্ছে, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের এই পর্ষদের উৎসাহই ছিল বেশি। পর্ষদের সিদ্ধান্তে বারবার ঋণ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয় খেয়ালখুশিমতো।

ব্যাংকের উদার আনুকূল্য পাওয়া এই গ্রাহক হচ্ছে এননটেক্স গ্রুপ। এর পেছনের মূল ব্যক্তি হচ্ছেন মো. ইউনুস (বাদল)। তিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। তাঁরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট ২২ প্রতিষ্ঠানের নামে সব ঋণ নেওয়া হয়। তাঁর মূল ব্যবসা বস্ত্র উৎপাদন ও পোশাক রপ্তানি।

জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে গত তিন বছর দায়িত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান। গত ৭ ডিসেম্বর তাঁর চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে তারা আরও ঋণ চেয়েছিল, আমি দিইনি। এ কারণে আমি তাদের শত্রুতে পরিণত হয়েছি। আর ঋণের প্রায় সবই আগের চেয়ারম্যানের (আবুল বারকাত) সময় দেওয়া।’

জনতা ব্যাংকের সাবেক এবং বর্তমান কয়েকজন ব্যাংকারও একই অভিযোগ করেছেন। এমনকি যাঁরা বাংলাদেশের আর্থিক খাতের খোঁজখবর রাখেন, তাঁরাও জানেন এক গ্রাহককে এত অর্থ দেওয়ার কথা। এমনকি তাঁর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আবুল বারকাতের নামও তাঁরা বলেছেন।

অধ্যাপক আবুল বারকাত প্রথম আলোকে বললেন, ‘তাঁর (ইউনুস বাদল) প্রতিষ্ঠানগুলো তো খুবই ভালো। পরিশোধেও ঠিক আছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর নথিপত্র এক ব্যক্তির নামে না। এ কারণেই এত ঋণ পেয়েছে।’

তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঋণ নেওয়া কোম্পানির অনেকগুলোই এননটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। বাকিগুলোও মো. ইউনুসের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। জনতা ব্যাংকের এখনকার পর্ষদের নথিতেও তাই। এ কারণেই জনতা ব্যাংক এখন এই ঋণ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। তিনিও বলেছেন, পুরো অর্থ দিয়ে ২২টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। কারখানাগুলোর সবই আন্তর্জাতিক মানের।

জনতা ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০০৪ সাল থেকে জনতা ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় প্রথম ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করে এননটেক্স গ্রুপের জুভেনিল সোয়েটার। ওই শাখার বেশি ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় ২০০৮ সালে জনতা ভবন করপোরেট শাখায় ঋণটি স্থানান্তর করা হয়। ২০১০ সাল থেকে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণসুবিধা নেওয়া শুরু হয়। এক ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে এত টাকা দেওয়ায় নতুন ঋণ দেওয়ার সব সামর্থ্যই এখন হারিয়ে ফেলেছে জনতা ব্যাংকের শাখাটি।

এর আগে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (বর্তমানে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল) শাখা থেকে ২০১১ সালের দিকে হল-মার্ক নামের গ্রুপটি বের করেছিল সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। তাতে সোনালী ব্যাংক এখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।

জনতা ভবন করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ থেকে দায়িত্বে আছেন আহমেদ শাহনুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শাখার ঋণ দেওয়ার সব সীমা শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু আদায়ের পেছনে ছুটছি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আইনে আছে, মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি এক গ্রুপকে দেওয়া যাবে না। এর বেশি ঋণ গেলে ব্যাংকের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে যায়। দেখতে হবে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে এসব অর্থায়ন হয়েছে কি না। কেন একজন গ্রাহককে এত টাকা দেওয়া হলো, পুরো বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে পারে।

যেভাবে ঋণ দিল ব্যাংক জনতা ব্যাংকের একাধিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান শেষে জানা যায়, কোম্পানিগুলোর নামে বিভিন্ন সময়ে কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হলেও টাকা পরিশোধ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে ব্যাংক নিজেই বাধ্য হয়ে বিদেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে অর্থ শোধ করে দিয়েছে। পরে গ্রাহক তা পরিশোধ করেনি। এভাবে নেওয়া ঋণসুবিধার (নন-ফান্ডেড) সব অর্থই সরাসরি ঋণে (ফান্ডেড) পরিণত হয়েছে। আবার দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনার জন্য নেওয়া চলতি মূলধনও (সিসি ঋণ) ফেরত দেয়নি।

২০১৫ সালে এননটেক্স গ্রুপের ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের অনুমোদন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই পুনর্গঠিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে গ্রুপটিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জনতা ব্যাংক। এ সুবিধার মানে হলো, প্রথমে শুধু কিস্তির টাকা পরিশোধ করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন না দেওয়ায় বিষয়টি আটকে আছে। তবে এতে চুপ না থেকে এসব ঋণ পুনঃতফসিল করে দিয়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ।

২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত এমডি এস এম আমিনুর রহমান। ঋণের বড় অংশই দেওয়া হয়েছে তাঁর সময়ে। তিনি বলেন, ‘শাখা থেকে প্রস্তাব এসেছিল, পর্ষদ বিবেচনা করে ঋণ দিয়েছে। আমার তো ঋণ দেওয়ার কোনো ক্ষমতাই ছিল না।’

জনতা ভবন করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন আব্দুছ ছালাম আজাদ। এখন তিনি এই ব্যাংকেরই এমডি। ঋণের বড় অংশই তিনি শাখা ব্যবস্থাপক থাকাকালীন সময়ে সৃষ্ট। তিনিও কাছে দাবি করেন, তাঁর সময়ে খুব বেশি ঋণ দেওয়া হয়নি। তবে আব্দুছ ছালাম বলেন, ঋণ কমাতে এননটেক্সকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, অন্য ব্যাংকে চলে যেতে বলা হয়েছে।

এখন উদ্বিগ্ন পর্ষদ মূলধনের দ্বিগুণ ঋণ দেওয়ার পর ২০১৭ সালে এসে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে জনতা ব্যাংকের এখনকার পর্ষদ। পর্ষদ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দফায় দফায় গ্যালাক্সি সোয়েটারসহ এননটেক্স গ্রুপের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সার্বিক চিত্র উপস্থাপন করতে বলে। বারবার সময় নেওয়ার পর গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্ষদের সভায় তা উত্থাপন করা হয়। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে পর্ষদ। ঋণ প্রদান ও আদায় পরিস্থিতি দেখে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গত ১৭ জানুয়ারি এননটেক্সের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ঋণসহ অন্য ব্যাংকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

মো. ইউনুস (বাদল) এ নিয়ে বলেন, ব্যাংক এখন অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। ব্যাংকের নির্দেশে ৮ প্রতিষ্ঠান অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরের চেষ্টাও চলছে। আগামী জুনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ভাই বিষয়টি দেখেছেন। তিনি ঋণ নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেননি।’

ভাগ্যবান উদ্যোক্তা মো. ইউনুস (বাদল) একসময় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সামান্য কর্মচারী ছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এখন ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাঁর উত্থান ঘটেছে। এ সময় ব্যাংক যেমন ছিল উদারহস্ত, তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন একাধিক মন্ত্রীর। পর্ষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অনেকে তো ছিলেনই, পিছিয়ে ছিলেন না ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। এমনকি সিবিএ নেতারাও আছেন তাঁর সঙ্গে।

ব্যাংক সূত্র জানায়, ঋণ পেতে পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক করে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন সিবিএ সভাপতি রফিকুল ইসলাম। ১৯৭৩ সাল থেকে জনতা ব্যাংক গণতান্ত্রিক কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ, জাতীয় শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত) সভাপতি তিনি। তাঁর নামে করা বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে নির্মিত হচ্ছে ২০১ গম্বুজ মসজিদ। এই মসজিদের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে ‘বাদল হেলিপ্যাড’।

রফিকুল ইসলাম জানালেন, ‘মসজিদ বানাতে সব মিলিয়ে ২৫০ কোটি টাকা লাগবে। ইউনুস (বাদল) সাহেব পুরো টাইলস দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে তাঁর অনুদান শতকোটি টাকা ছাড়াবে।’

তবে মো. ইউনুস (বাদল) দাবি করেন, ‘সর্বোচ্চ আড়াই কোটি টাকা দিয়েছেন। সিবিএ সভাপতি সব সময় একটু বাড়িয়ে বলেন।’

কেবল সিবিএ নেতাই নন, মো. ইউনুসের ঋণের বিষয়ে তদবির করে প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন যুবলীগ নেতা, কমিশনার, একাধিক ব্যাংকার, এমনকি সাংবাদিকও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সামগ্রিক বিষয় নিয়ে বলেন, একটি ব্যাংক কীভাবে পারল একজনকে ৫ হাজার কোটি টাকা দিতে। নিশ্চয়ই বড় কেউ রয়েছে এর পেছনে। এটার পেছনে কারা, তা খুঁজে বের করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তাই ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও দুদককে এ ক্ষেত্রে সক্রিয় হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কার্যক্রম আরও জোরালো করার সময় এসেছে।

সূত্র: প্রথম আলো