• রবিবার, ২৭ মে ২০১৮, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

তোফায়েলের আফসোস, এভাবে যেতে হয় জগলুল ভাই!

প্রকাশ:  ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২২:৪৩ | আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২৩:৪১
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট
একটি মৃত্যু সংবাদে ঘুম থেকে জোগে ওঠা সকালে একটি শহর কেঁদে উঠল। দিনের সকল কর্মকাণ্ড এলোমেলো হয়ে গেলো। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে বাতাসে খবর ছড়াতে থাকল। একদম আকস্মিক বিনা নোটিশে অকালে চলে গেলেন সুনামগঞ্জ পৌরসভার টানা দু’বারের নির্বাচিত মেয়র আইয়ুব বখত জগলু। সিলেটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা শেষে ঢাকায় এসেছিলেন জগলুল। সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সহকারী। উঠেছিলেন হোটেল আল-ফারুকে। সেখান থেকে দলীয় রাজনীতি মাথায় রেখে, সঙ্গে পৌরসভার উন্নয়ন নিয়ে মন্ত্রণালয় ও নেতাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেছিলেন। সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তার দুঃসময়ের কর্মী আইয়ুব বখত জগলুলকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক করতে চেয়েছিলেন। নানা নাটকীয়তায় শেষ পর্যন্ত সেটি আর হয়ে ওঠেনি। জগলুল জাতীয় কমিটির সদস্য হয়েছিলেন।

তিনি চেয়েছিলেন, পুর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণাকালে তার নামটি সিনিয়র সহসভাপতির জায়গায় থাক। বাবা হোসেন বখত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক সাহসী সংগঠক। আজীবন আওয়ামী লীগার। বড় ভাই মনোয়ার বখত নেক সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান (মেয়র) ছিলেন। তার অকাল মৃত্যুতে আইয়ুব বখত জগলুল পৌর নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছিলেন আরেক নন্দিত নায়ক মমিনুল মউজদীনের সঙ্গে। টানা তিনবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। মমিনুল মউজদীনের সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী-পুত্রসহ করুণ মৃত্যু সুনামগঞ্জবাসীকে অশ্রুসাগরে ভাসিয়েছিল। সেই শূন্যাতা আজও পূরণ হয়নি। মমিনুল মউজদীনের মৃত্যুর পর টানা দু’বার পৌর মেয়র নির্বাচিত হয়ে আইয়ুব বখত জগলুল দৃষ্টিনন্দন নানা উন্নয়ন চিত্রপট দিয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার বর্ধিত রাস্তা-ঘাট থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত দৃষ্টনন্দন সুরমা পার্ক উপহার দিয়েছিলেন। মানুষের হৃদয় জয় করে নিজের নেতৃত্বকে সুসংহত করেছিলেন।

একদিকে গণমুখী রাজনীতিবিদ ও অসম্প্রাদয়িক সাহসী চরিত্র বর্ণময় করে একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে পৌরসভার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। জীবন তার একদিনে তৈরি হয়নি। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছিলেন। পঁচাত্তর দুঃসময়ে সুনামগঞ্জ ছাত্রলীগের যে নবজাগরণ ঘটেছিল, সেখানে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন আমার অগ্রজ মতিউর রহমান পীর। তার সঙ্গে প্রথম দফায় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন হায়দার চৌধুরী লিটন ও দ্বিতীয় দফা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আনোয়ার চৌধুরী আনুল। আরও অনন্য সাধারণ সংগঠকরা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সেদিন সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন।

৭৯ সালে প্রথম কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এজিএস আনুল চৌধুরীর নেতৃত্বে। পরে কলেজ ছাত্র সংসদ ভিপি, এজিএসসহ পূর্ণ প্যানেলে জয় লাভ করে ছাত্রলীগ। সেখানে ভিপি পদে মানিক লাল দে ও সাধারণ সম্পাদক পদে আইয়ুব বখত জগলুল নির্বাচিত হন। তারপর তাকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। লাজ-নম্র সভাবের জগলুল বক্তৃতা করতেন না। সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। সাহস ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অটল থাকতেন। মনে এক, চেহারায় এক এ চরিত্র তার ছিল না।

৮১ সালের ছাত্রলীগের ভাঙন ঘিরে সবাই ফজলু ও চুন্নুর নেতৃত্বাধীন ধারায় যুক্ত হলে আইয়ুব বখত জগলুল কিছু কর্মী নিয়ে জালাল জাহাঙ্গীর ধারাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সেই থেকে হয়ে উঠেছিলেন আওয়ামী লীগের মূল ধারার তরুণ সম্ভাবনাময় সংগঠক। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণ হন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি। তিনি পরবর্তীতে এরশাদ জামানায় কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। তার ধারাবাহিকতায় উঠে আসেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। নিজের মতো করে, নিজের ধ্যান-ধারনায় আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে নিজের জায়গা করে নেন আপন মহিমায়। ছাত্র রাজনীতির যুগে নানামত ঘিরে তার সঙ্গে বিরোধ হলেও অগ্রজ-অনুজের সম্পর্কের চিড় ধরেনি। পরবর্তীতে হৃদ্যতা ও সখ্যতা গড়ে উঠেছিল।

৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এলে ৩৬ বছর বয়সে জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতারা সেই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। আইয়ুব বখত জগলুল রাজনীতি আজীবন ছিল বৈরী স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা। দলীয় রাজনীতির নানা মেরুকরণ, উপদলীয় কোন্দলের শিকার তাকে হতে হেয়েছিল বার বার। দল ক্ষমতায় থাক আর বিরোধী দলে থাক তার রাজনীতির জীবন ছিল সংগ্রামের।

কখনো বড় নেতাদের ঝাঁকুনি, কখনো সংঘবদ্ধ স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতিরোধ মোকাবেলা করে তাকে নিজের মতো করে দলীয় রাজনীতির পথ বের করে সাংগঠনিক শক্তিতে গণমুখী চরিত্র নিয়ে হাঁটতে হয়েছে। নেতৃত্বের বিরোধ দলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবু তিনি নিজের মতোই করে বার বার ব্যক্তিগত দক্ষতায় ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। রাজনীতিতে নিজের জায়গা ধরে রাখার লড়াই করেছেন। অন্তহীন দহন সয়েছেন। মানসিক চাপ সয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অসম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কর্মীর সততার সুনামও কুড়িয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে সব কিছুতেই তার পরীমিতবোধ ছিল। রাজনীতির বাইরে কখনো ধুমপানের অভ্যাস বা আলস আড্ডার লোক তিনি ছিলেন না। নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে জীবন কাটাতেন। সর্বশেষ রাজনীতির নানামুখী স্নায়ু চাপের মধ্যে এক নতুন লড়াই শুরু করেছিলেন।

আগের বৃহস্পতিবারে শহরে তার সমর্থকদের নিয়ে বিশাল মিছিল করেছিলেন। আর এই বৃহস্পতিবার সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে চলে গেছেন। আরেক দফা গোটা শহর কেঁদে উঠেছে। যে শহরকে ভালবেসে জন্মেছিলেন, যে শহরকে ভালবেসে রাজনীতিতে এসেছিলেন, সেই শহর তাকে উজাড় করা ভালবাসায় পৌর মেয়রের দায়িত্ব অর্পণ করেছিল। যতদূর খবর গেছে এই মৃত্যু সংবাদ মানুষের চোখ অশ্রুস্বজল করেছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে এক সাহসী তরতাজার  তরুণ প্রতিনিধির নিথর দেহ কফিনে শায়িত করে হেলিকপ্টার যখন তার প্রিয় সুনামগঞ্জ শহরে নামল, তখন হাজার হাজার শোকার্ত মানুষের ঢল নেমেছে বুক ভরা ক্রন্দন নিয়ে। টানা কয়েকদিন অসুখে ভোগে ল্যাব-এইডে ভর্তি হয়েছিলাম। আইয়ুব বখত জগলুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এককালের জাসদ ও আজকের বিএনপি নেতা অ ত ম মিসবাহ সকালে ফোনটি যখন করলেন, দুঃসংবাদ দিতে তার বুক কাঁপছিল। বলছিলেন, হার্ট অ্যাটাক করেছে খোঁজ নিতে। তখনো মৃত্যুর কথা আমার মাথায় আসেনি। ইতিমধ্যে দফায় দফায় ফোন আসে। হাসপাতালের বেডে আমি অস্থির হয়ে উঠি। এই মৃত্যু, এই দুঃসংবাদ কারো কাম্য ছিল না।

একটি শহরের রাজনৈতিক-সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় পৌর মেয়র হিসেবে, রাজনীতিবিদ হিসেবে যে দৃঢ়তা নিয়ে আইয়ুব বখত জগলুল দাঁড়িয়েছিলেন, সেই নেতৃত্ব অপরিহার্য ছিল মানুষের জন্য। একটি শক্তিশালী বৃক্ষের এভাবে ঝরে পড়া অরেক দফা রাজনৈতিক নেত্বতের শূন্যতা সৃষ্টি করল। একজন রাজনৈতিক নেতা একদিনে তৈরি হন না। আইয়ুব বখত জগলুলও একদিনে তৈরি হননি। এই শূন্যতা কবে পূরণ হবে জানি না। তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এই বেলায় তার প্রস্তুতি ছিল সদর আসনে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন চাওয়ার। চেষ্টা চালিয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হচ্ছে সেখানে সিনিয়র সহসভাপতি পদে থাকার। এইবার ঢাকায় এসে অনেক নেতার সঙ্গে দেখা করার পর বুধবর সন্ধ্যায় তিনি আওয়ামী লীগের প্রবীন রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে দেখা করেছেন। জেলার রাজনীতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরেছেন। নিজের সামান্য ইচ্ছেটুকু প্রকাশ করেছেন।

তোফায়েল আহমেদ আইয়ুব বখত জগলুলকে কথা দিয়েছিলেন, তিনি এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করবেন। পরে আলোচনাও করেছেন। কিন্তু আইয়ুব বখত জগলুলকে তা আর জানানো হয়নি। একটি শহরকে কাঁদিয়ে কাউকে কিছু না বলে অনেকটা নীরব অভিমানে রাজনীতির অন্তহীন দহন সয়ে জগলুল ভাই নীরবেই চলে গেলেন। দল, মানুষ ও আমাদের কারো কাছে তার আর কিছু চাওয়ার নেই। কোনো দিন কারো কাছে কিছু চাইতেও আসবেন না। কিন্তু এইভাবে অকালে হুট করে চলে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে তার দলের অগনিত কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষের একটি শক্তির জায়গা, একটি আশ্রয়ের ঠিকানার অবসান ঘটিয়ে গেলেন। তোফালে আহমেদ আলাপকালে জগলুল ভাইয়ের জন্য আফসোস করছিলেন, মনে হচ্ছিল নিয়তির কি অমোঘ বিধান এভাবে

বিনা নোটিশে চলে যেতে হয় জগলুল ভাই! দুঃসময়ের মাঠের কর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার থেকে দলের অনেক নেতার স্নেহমাখা শুভ দৃষ্টির কর্মী ছিলেন আইয়ুব বখত জগলুল। মানুষকে কাঁদিয়ে মানুষের ভালবাসা অর্জন করে তাই বলে এইভাবে হুট করে চলে যেতে হয়? এই মৃত্যু বিশ্বাসযোগ্য নয়। এই মৃত্যু শোক বইবার নয়। যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন। আপনার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

লেখক: প্রধান সম্পাদক পূর্বপশ্চিমনিউজবিডি.কম