• রবিবার, ২৭ মে ২০১৮, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

অতীত রাজগৌরবের ঝলকানি নাকি রাজনীতির গোলাজল?

প্রকাশ:  ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৬:২২ | আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৮:৫৬
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত
প্রিন্ট
অতীত রাজ গৌরবের ঝলকানি, নাকি বর্তমান রাজনীতির ঘোল জল? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন সঞ্জয় লীলা বানশালির পদ্মাবত ছবিটি ঘিরে দেশজুড়ে সাম্প্রতিক বির্তক এবং তা আরো বাড়িয়ে দফায় দফায় দাঙ্গা হাঙ্গামা এবং হিংসাত্মক যে ঘটনাগুলি ঘটে গিয়েছে, তার পেছনে নিখাদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই ছিল প্রকট। রাজপুত সমাজের অতীত রাজ-গৌরব রক্ষার লড়াইটা যে আসলে নেহাতই উপলক্ষ, আসল লক্ষ্য আসন্ন নির্বাচনগুলোতে জাতপাতভিত্তিক ভোট কব্জা করা, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ঠ হয়ে গেছে।

সামনেই দুটি বড় রাজ্যেও ভোট। রাজস্থান এবং মধ্যপ্রদেশ। তারপরেই আগামী বছর রয়েছে লোকসভা নির্বাচন। এমনও শোনা যাচ্ছে যে লোকসভা ভোটও হয়ত এগিয়ে আনা হতে পারে। এই নির্বাচনগুলি একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভও করছে বিজেপি তাদের শাসনকালের মেয়াদ বাড়াতে পারবে কিনা। দ্বিতীয়ত কংগ্রেস তথা বিরোধী শিবিরের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা তাদের হারানো জমি ফিরে পাবে কিনা, সেই প্রশ্নেরও উত্তর পাওয়া যাবে এই নির্বাচনগুলিতে।

ঐ দুটি রাজ্যেই রাজপুত ভোট রয়েছে ১০ শতাংশের ওপর। হিন্দি বলয়ের অন্যান্য রাজ্যেও আছে যথেষ্ট সংখ্যক রাজপুত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে-এই বিরাট সংখ্যক রাজপুত ভোট কব্জা করতেই কি পদ্মাবত নিয়ে দেশজুড়ে হাঙ্গামা? সাম্প্রতিক সীমাক্ষাগুলোতে দেখা গিয়েছে মোদি তথা বিজেপির ম্যাজিক দ্রুত লুপ্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মূল্যবান রাজপুত ভোট হাতছাড়া করতে চাইবে না বিজেপি। আর সে কারণেই রাজপুত ভাবাবেগকে উস্কে দিয়ে রাজনীতির ঘোলা জলে মাছ ধরার চেষ্টা বলেই মনে করা হচ্ছে।
দেশজুড়ে হাঙ্গামার মুখ হিসাবে সামনে কারনি সেনা থাকলেও পেছনের যাবতীয় কলকাঠি যে বিজেপিই নেড়েছে তাও জলের মতোই স্পষ্ট। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, বিজেপি শাসিত কোনো রাজ্যেই হাঙ্গামা ঠেকানোর কোনো রকম উদ্যোগ সরকার নেয়নি। দাঙ্গা থামানো তো দূরের কথা চারটি বিজেপি শাসিত রাজ্য পদ্মাবত প্রথম সুযোগেই নিষিদ্ধ করে দেয়। সুপ্রিমকোর্টে স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এই রাজ্যগুলির প্রশাসন তান্ডবের ঘটনাগুলিতে হাত গুটিয়ে বসেছিল। এমনকি সুপ্রিমকোটের সওয়াল-জবাব পর্বে তারা শেষ পর্যন্ত পদ্মাবত নিষিদ্ধ করার ওপরই জোর দিয়ে এসেছে। অন্যদিকে কংগ্রেসসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দলকেও পদ্ম শিবিরের মদতপুষ্ট এই হাঙ্গামার বিরুদ্ধে তেমনভাবে সরব হতে দেখা যায়নি। সেখানেও কারণ একই রাজপুত ভোট হারানোর ভয়।

আরো তাৎপর্যপূর্ণ হল, পদ্মাবত বির্তক নিয়ে প্রথম দিকে কংগ্রেসের চোট-মাঝারি নেতাদের দিয়ে দু’চার কথা বলানো হলেও, তার সুরও ছিল বেশ নরম। কিন্তু রাহুলগান্ধী-সহ কংগ্রেসের বাঘা বাঘা নেতারা পদ্মাবত নিয়ে সেভাবে মুখ খোলেননি, বা এখনও খুলছেন না। পদ্মাবত বির্তকে রাজপুত ঐতিহ্য ও গৌরবহানির প্রসঙ্গটি যে নেতাহই জোলো এবং অর্থহীণ, তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে আরো কয়েকটি ঘটনায়। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আসলে এই ছবিটিতে রাজপুত গরিমা এবং ভাবাবেগে আঘাত লাগার মতো তেমন কিছুই নেই। পরোক্ষ সেন্সর বোর্ডও সেটাই মেনে নিয়েছে। নাহলে তারা বিজেপির পরোক্ষ হুমকি উপেক্ষা কওে কোনো মতেই কোনো মতেই পদ্মাবতকে সার্টিফিকেট দিত না। বস্তুত ছবিটি তেরি করার আগে পদ্মাবতের পরিচালক ও প্রযোজকরা চিতোরের রাজ পরিবারকে ছবিটির চিত্রনাট্যটি পড়িয়ে নিয়েছিলেন। তারা চিত্রনাট্যটি পড়ে ছবিটি তৈরি করার ব্যাপারে অনুমোদন দেন। তারপরেও ছবিটি নিয়ে আপত্তির কথা ওঠার পরে নির্মাতারা ৪০টি রাজপুত সংগঠনের নেতৃত্বকে একত্রেবসিয়ে ছবিটি প্রর্দশনের ব্যবস্থা করেন। তারাও সে সময় ছবিটিতে খারাপ কিছু দেখতে পাননি।
জয়পুরের মহারাণী পদ্মিনী দেবী এবং তার কন্যা বিজেপি বিধায়ক দীয়া কুমারী রাজ পরিবারের থেকে প্রথম আপত্তি তুলেছিলেন। তারা জোর দিয়েছিলেন, ছবিটি রিলিজ করার আগে তাদের দেখাতে হবে এবং ছবিতে কোনো রকম ইতিহাস বিকৃতি ঘটানো চলবে না। যদিও ইতিহাসবিদদেও একটা বড় অংশই মনে করেন পদ্মাবত কাব্যটি আদতে ফিকশনই। বাস্তবের সঙ্গে, বা ইতিহাসের সঙ্গে এর কোনো রকম সর্ম্পকই ছিল না। জয়পুরের রাজ পরিবারের আরেক সদস্যা রু´িণী কুমারীও বলেছিলেন, ছবিটির আপত্তিকর অংশগুলি ছেঁটে ফেলে সেটিকে রিলিজ করতে দেয়া যেতে পারে। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ পুষ্পেশ পন্থ বলেছেন, রাণী পদ্মাবতী নামে কোনো চরিত্র থাকতেই পাওে, কিন্তু পদ্মাবতকে কোনোভাবেই ঐতিহাসিক ঘটনা বলে বর্ণনা করা যায় না। এই ছবিকে উপলক্ষ কওে কারনি সেনা সভ্যতার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করে মত প্রকাশের স্বাধীণতার মতো গুরুত্বপূর্ণ একচি বিষয়কে তছনছ করেছে।

উল্লেখ্য, রাজপুত ভাবাবেগের প্রেক্ষাপট রয়েছে জহর ব্রত’র মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ইতিহাসবিদদের লেখা থেকে পাওয়া যায় উত্তর পশ্চিম ভারতের বেশ কিছু জায়গায় জহর ব্রত (সম্মান রক্ষায় মহিলাদের আত্মহুতি দেয়া) প্রচলিত ছিল। মেওয়াওে শ্রেষ্ঠ বীর মহারানা প্রতাপের সময়ই রাজপুত সমাজে আলোচিত ছিল প্রথাটি। মেওয়ার সাম্রাজের রাজধানী ছিল চিতোর।
আলাউদ্দিন খিলজির সেনাবাহিনীর হাতে রাজা রতন সিংয়ের পর্যুদস্ত হওয়ার পর চিতোরের প্রায় ১৬ হাজার রমনী আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। পদ্মাবত কাহিনী অনুসাওে জহরকুন্ডে এই জহর ব্রতের প্রথমেই ছিলেন রাণী পদ্মাবতী। রতন সিংয়ের পরাজয়ের খবর আসতেই চিতোর দূর্গের ভেতর এক গোপন জায়গায় রাণী পদ্মাবতীর নেতৃত্বে একত্র হন রাজপরিবারের সমস্ত মহিলা। তাদের সঙ্গে ছিলেন সেনাদের স্ত্রীরাও। গোপন একটি সুড়ঙ্গ দিয়ে দুর্গ থেকে জহর কুন্ড পৌঁছান তারা। হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে এরপর একে একে গায়ে আগুন দিয়ে ঝাঁপ দেন তারা। কার্যত জনশূন্য চিতোর দূর্গে আসেন বিজয়ী আলাউদ্দিন খিলজি। কতিথ আছে জহর কুন্ড থেকে এমন উত্তাপ ছড়িয়েছিল যে আলাউদ্দিন খিলজি পাকাপাকিভাবে ঐ গোপন সুড়ঙ্গটি বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এই ঘটনার পর থেকেই জহর ব্রত রাজপুত রমনীদের কাছে পরম এক গর্বের বিষয় বলে চিহ্নিত হয়ে আছে। 
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পদ্মাবত নিয়ে এই হাঙ্গামা সর্ম্পূণ রাজনৈতিক এবং পূর্বপরিকল্পিত বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ ছবিটিতে আপত্তিকর কিছু থাক বা না থাক, রাজপুত সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিতে, পদ্মাবত ছবিতে রাজপুত রমনীদেও খাটো করা হয়েছে, এই প্রচার লাগু করে দেয়া হয়। সেই প্রচারের জেরে এখন চার বিজেপি শাসিত রাজ্যে আগুন ছড়ানো হচ্ছে রাজপুত-মনকে 

# লেখক ভারতের নবীন সাংবাদিক
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

/মজুমদার