• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

বায়স্কোপের নেশায় মানিকগঞ্জের আতোয়ার

প্রকাশ:  ০৯ জুলাই ২০১৮, ১৭:৫৪ | আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৮, ১৮:০৯
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট

‘তোমার বাড়ির রঙ্গের মেলায় দেখেছিলাম বায়স্কোপ, বায়স্কোপের নেশায় আমায় ছাড়ে না’- দলছুট ব্যান্ডের এই গানটি সত্যে রূপান্তরিত হয়েছে মানিকগঞ্জের আতোয়ার রহমানের জীবনে। সেই যে তরুণ বয়সে বায়স্কোপের বাক্সকে জীবিকার সম্বল করেছেন, চল্লিশোর্ধ বয়সেও সেই বায়স্কোপ কাঁধে নিয়েই ছুটে চলেছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ঐতিহ্যবাহী বায়স্কোপ দেখিয়েই ১৫ বছর ধরে আতোয়ার সংসার চালাচ্ছেন।

আতোয়ার রহমানের বাড়ি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার পয়লা গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই বায়োস্কোপের প্রতি দুর্বলতা। তার বাবা পাষাণ পাগলাও বায়োস্কোপ দেখাতো, তবে এটি তার একমাত্র পেশা ছিল না। বাবার কাছে তালিম নিয়ে বায়োস্কোপ দেখানোকেই একমাত্র পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন আতোয়ার। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ দেখাতে দেখাতে কেটে গেছে ১৫টি বছর । মানিকগঞ্জ জেলার ৭টি উপজেলার বিভিন্ন মেলা, পূজা, পার্বণে আতোয়ার তার বায়োস্কোপ দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এ ছাড়া জেলার আশে পাশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে চুক্তির মাধ্যমে এ হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ বিনোদন বায়োস্কোপ প্রদর্শন করে থাকেন।

আতোয়ার তার টিনে তৈরি বায়স্কোপের বাক্সের প্রতি ভেঁপু বাঁশি বাজিয়ে বায়োস্কোপয মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। সেই সঙ্গে সুরে সুরে বলেন, দুলদুল ঘোড়া, মক্কা-মদিনা, আজমির শরীফ অথবা ক্ষুদিরামের ফাঁসি দেখবেন। লোকজন জড়ো হলে খুলে দেন বায়স্কোপ বাক্সের ঢাকনাগুলো। তাতে চোখ রাখেন নানা বয়সী মানুষ। আর আতোয়ার সুরে সুরে গেয়ে যান, কী চমৎকার দেখা গেলে এইবারেতে আইসা গেল, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। কী চমৎকার দেখা গেল…।’ এভাবেই বায়োস্কোপের কাঁচের জানালায় চোখ রাখলে ছবি আর বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠে অজানা পৃথিবী। প্রায় হারিয়ে যাওয়া বায়োস্কোপ দেখিয়ে আজও শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ সকল বয়সের মানুষকে সমান তালে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছেন আতোয়ার রহমান।

আতোয়ার রহমান জানান, তার বায়োস্কোপে সবোর্চ্চ ৬ জন একসাথে তার প্রদর্শনী উপভোগ করতে পারে। রিল হিসেবে টিকেট মূল্য নির্ধারিত হয়। প্রদর্শনীর সময়সীমা অনুযায়ী টিকেট মূল্য কম-বেশিও হয়ে থাকে। আবার শহর অঞ্চল-গ্রামাঞ্চল ভেদে প্রদর্শনী মূল্যর তারতম্য আছে। গ্রাম্যমেলাগুলোতে প্রতি শো ৩০ টাকা এবং বায়না শো তথা শহরাঞ্চলে শো প্রতি ৬০ টাকা নির্ধারিত হয়ে থাকে। তাঁর ভাষ্যমতে, মেলাকেন্দ্রিক এই পরিবেশনায় সাধারণত দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভীড় থাকে বেশী। ফলে, ভীড়ের অবস্থা অনুযায়ী রিল টানা দ্রুত-ধীর হয়ে থাকে। দিন শেষে যা থাকে তাই দিয়েই কোন রকমে সংসার চালাচ্ছেন।

বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি আরও জানান, বায়োস্কোপ আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির একটি ঐহিত্য বহন করে। তবে আজ এর অবস্থা একেবারেই সংকটাপন্ন।

তবে বায়োস্কোপে নানা রং-ঢংয়ের মাধ্যমে বর্ণনা দিয়ে একটি দৃশ্যকে বাস্তবে রূপান্তর করতে হয়, যা একটি কষ্টসাধ্য কাজ। যদিও, এলাকার ক’জন আগ্রহী তার সাথে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু তার ভাষ্য মতে, কাছে আসতে হবে, হৃদয় দিয়ে নিতে হবে। নতুনরা সেই কষ্ট স্বীকার করার করতে তেমন আগ্রহী নন। এক্ষেত্রে নিজ পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে নিজ সন্তান কে বায়োস্কোপ পরিবেশনা শেখানোর বিষয়েও তিনি তেমন উৎসাহী নন। যদি কখনো তারা শেখার জন্য আগ্রহ দেখায়, তাহলে শেখাতে পারেন।

আতোয়ার রহমান জানান, তার বায়োস্কোপ এর জনপ্রিয়তা শুধু মানিকগঞ্জ থেমে থাকে নি। নিজ জেলার ছাড়াও বিভিন্ন সময় আমন্ত্রণ পড়ে। ঢাকার কয়েকটি মেলা, বগুড়া, টাঙ্গাইল জেলা শহরেও তিনি ঘুরে ঘুরে বায়োস্কোপ দেখান। যতদিন তার দেহে প্রাণ থাকবে ততদিন তার বায়োস্কোপ পরিবেশনা মানুষের জন্য উন্মোক্ত থাকবে।

এ ব্যাপারে সাটুরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সামাজ বিজ্ঞানের প্রভাষক সামিম আরা জানান, বায়োস্কোপ আমাদের সংস্কৃতির শিকড়, কিন্তু আমরা আধুনিকতার ছোয়ায় তা ভুলে গেলে চলবে না। বিশেষ করে স্যাটেলাইটের যুগে টিভি, মোবাইল, ইন্টারনেট এর প্রতিযোগীতায় আমাদের দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর বায়োস্কোপ টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারী উদ্যোগ নেওয়া উচিত। নতুবা এ বায়োস্কোপ জাদুঘরে গিয়ে এ প্রজন্মের সন্তানদের দেখাতে হবে।

বায়স্কোপের নেশা,বায়স্কোপ
apps