• বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ৮ ১৪২৫
  • ||
  • আর্কাইভ

নতুন ইতিহাস গড়ছে গণ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ:  ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৯:৫২
মুন্নি আক্তার, গণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রিন্ট

যেখানে ২৮ বছর ধরে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাবিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই, সেখানে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়। আগামী ১৫ফেব্রুয়ারি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বারেরমত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একমাত্র গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। 

এবার ৬টি পদের বিপরীতে ২৩ জন প্রার্থী চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় স্থান পেয়েছেন। আগে দুটি পদে নির্বাচন হলেও এবার প্রথম ৬টি পদে নির্বাচন অনু্ষ্ঠিত হবে। পদগুলো হলো  সহ--সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ, ক্রিয়া সম্পাদক, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক, প্রচার ও সমাজসেবা সম্পাদক।  সহ-সভাপতি পদের জন্য ৩ জন, সাধারণ সম্পাদক ৫ জন, কোষাধ্যক্ষ্য ৪ জন, ক্রীড়া সম্পাদক ৪ জন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক ৪ জন, প্রচার ও সমাজসেবা ৩ জন প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।সহ-সভাপতি পদের জন্য ৩ জন, সাধারণ সম্পাদক ৫ জন, কোষাধ্যক্ষ্য ৪ জন, ক্রীড়া সম্পাদক ৪ জন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক ৪ জন, প্রচার ও সমাজসেবা ৩ জন প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।

দেশের সরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবছরই ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটাই হয়েছে। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর আর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনও বহু বছর ধরে হয়নি। শিক্ষাঙ্গনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ধারার ছাত্ররাজনীতির ইতিবাচক ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তা ছাড়া জাতীয় রাজনীতিতে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকারের অনেক মন্ত্রী একসময় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন।  

সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে ছাত্রদের নির্বাচিত ছাত্র সংসদের হাতে। ছাত্ররা ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কী ভূমিকা রেখেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না এবং তার পেছনে তত্কালীন ছাত্র সংসদ সমূহের অবদান অনস্বীকার্য।

ছাত্র অঙ্গন থেকে কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টির প্রয়োজনেই নয়, শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশের স্বার্থেই ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন জরুরি। ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে সংগঠনগুলোর বাহাস-বিতর্কের মধ্য দিয়ে মুক্তবুদ্ধিচর্চার ক্ষেত্র অবারিত হয়। তাছাড়া ছাত্র সংসদকে ঘিরে খেলাধুলা, নৃত্য, নাটক, গান, সাহিত্য আসর, বিতর্কসহ নানা আয়োজন হয়, যার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু শিখতে পারে। এসব চর্চার ফলে শিক্ষা পরিপূর্ণ হয়, মানবিকবোধ জাগ্রত হয়, গড়ে ওঠে আগামী দিনের সুনাগরিক। শিক্ষার এ অঙ্গন পতিত রেখে আমরা যেন কেবল 'কেরানি' সৃষ্টির দিকেই মনোযোগ দিয়েছি!

আজ তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি, জঙ্গিমুখিতাসহ যেসব পদস্খলন দেখা যাচ্ছে, সাংস্কৃতিক কর্মমুখর শিক্ষাঙ্গন এসবের প্রতিরোধক। আর সাংস্কৃতিক কর্মমুখর শিক্ষাঙ্গনের জন্য প্রয়োজন ছাত্র সংসদ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব যদি হয়ে থাকে শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমিক ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে এবং সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, তা হলে ক্লাসের পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে তা বাস্তবায়ন করা মোটেও সম্ভব নয়। ক্লাসের বইপত্র-লেকচারের বাইরেও শিক্ষার্থীদের জন্য নানামুখী সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকা-, অধিকারবোধের জাগরণ, জনসম্পৃক্ত কর্মকা-, স্বদেশ ও বিশ্বের নানা ঘটনার সঙ্গে পরিচয় ও সম্পৃক্তি, মুক্তচিন্তার বিকাশ, যুক্তিবাদী মানসিকতা আত্মস্থ করা, সৃজনশীলতার বিকাশ ইত্যাদি একান্ত আবশ্যক। নির্বাচিত ছাত্র সংসদ হতে পারে এসব কাজের একটি প্রধান বাহন। তাই এ কথা বলা যায়, পাঠ্যবই, ক্লাস, লেকচার, পরীক্ষা ইত্যাদি যেমন কিনা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবশ্যিক অঙ্গ, ঠিক সমান গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি হলো ছাত্র সংসদের মাধ্যমে পরিচালিত এ ধরনের বহুমাত্রিক কাজকর্ম। এই বিবেচনায় যুক্তিসঙ্গতভাবে এ কথাও বলা যায়, নিয়মিতভাবে ক্লাস, পরীক্ষা ইত্যাদি না দিতে পারলে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যেমন বন্ধ করে দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি বছর বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের মাধ্যমে এসব কাজ সংগঠিত করতে না পারলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। অথচ গত আড়াই দশক ধরে আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের কাজকর্ম ছাড়াই চলতে দেওয়া হচ্ছে।
ছাত্র সংসদগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো শিক্ষার্থীদের ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। ক্লাসরুমের ভাঙা চেয়ার-বেঞ্চ-টেবিল, সাদা হয়ে যাওয়া ব্ল্যাকবোর্ড, লাইব্রেরিতে বইয়ের স্বল্পতা, সেশনজট, টয়লেটের সমস্যা ইত্যাদি থেকে শুরু করে ছাত্র বেতনের হার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বাস সার্ভিস ব্যবস্থাপনা, শিক্ষানীতি, শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ, মুক্তিবুদ্ধিচর্চার অবারিত সুযোগ, সমাজের সামগ্রিক গণতন্ত্রায়ন ইত্যাদি নানা বিষয় ছাত্র সংসদের কর্মকা-ের এখতিয়ারভুক্ত। ছাত্রজীবন ও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে এসব প্রতিটি বিষয় প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত। এসব বিষয় ছাড়াও আছে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত নানা বিষয়। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থাও শিক্ষাব্যবস্থাকে ও ছাত্রজীবনকে সরাসরি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানচর্চার পরিবেশকে এবং ছাত্রজীবন অব্যাহত রাখার আর্থিক সামর্থ্যকেও বহুলাংশে প্রভাবিত করে। তা ছাড়া সব শিক্ষার্থীকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা শিক্ষার একটি প্রধান লক্ষ্য। দেশ-জাতি-জনতার সেবক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলাটা সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই অন্যতম কাজ। নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকলে এ দায়িত্ব সংগঠিতভাবে পালিত হবে কী করে?

ছাত্ররা সবসময়ই ছিলো সচেতন এবং জাতির বিভিন্ন সংকটে তারাই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছে। তবুও ছাত্রসংসদ নির্বাচনে যে শূন্যতা বিরাজ করছে। সুস্থ রাজনীতি চর্চার অভাবে ছাত্র সমাজের মধ্যে দেশপ্রেম,  পরার্থপরতা, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। এই তরুণরা সহজেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং এমনকি জঙ্গিবাদের মতো ভয়ঙ্কর পথেও পা বাড়াচ্ছে। এই অবক্ষয় দূর করে ছাত্রসমাজকে দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারলেই, এরাই পরবর্তীকালে সকল অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারবে। আর এজন্য প্রয়োজন সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।

ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসুসহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন করার বিষয়ে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। ছাত্রদের গণতন্ত্র,  দায়িত্বশীলতা আর জবাবদিহিতার দীক্ষা নেয়ার সব বাধা দূর করে কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ঐতিহ্য ফিরে আসুক।  ছাত্র-রাজনীতির গৌরবময় অধ্যায় ফিরিয়ে আনতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হোক।

/এস কে